ভারত–আফগানিস্তান সম্পর্কের নতুন অধ্যায় — কূটনীতির নতুন দিগন্তে তালিবান সফর
সম্পাদকীয়: আন্তর্জাতিক রাজনীতির মানচিত্রে বৃহস্পতিবারের দিনটি এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে রইল। আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ছ’দিনের সফরে ভারতে এসেছেন। প্রায় চার বছর আগে কাবুল দখলের পর এটাই তালিবান সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম উচ্চপর্যায়ের ভারত সফর। রাষ্ট্রপুঞ্জ এখনও তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি, তবু ভারত এই সফরকে কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি অংশ হিসেবেই দেখছে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সব সময়ই বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক। আফগানিস্তানের মাটিতে ভারতের বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তালিবান শাসনের পর সেই বন্ধন ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভারত কখনও সম্পূর্ণভাবে দরজা বন্ধ করেনি। মুত্তাকির এই সফর সেই উন্মুক্ত দরজার প্রতীক।
এই সফরে তাঁর বৈঠক হবে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল-এর সঙ্গে। আলোচনায় আসতে পারে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, মানবিক সাহায্য এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন— এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে কূটনৈতিক মহল। যদিও আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারকে ভারত এখনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তবু আলোচনার টেবিলেই সমস্যার সমাধান খোঁজার ঐতিহ্যই ভারতীয় কূটনীতির শক্তি।
রাষ্ট্রপুঞ্জের সাময়িক অনুমতি নিয়ে মুত্তাকির বিদেশ সফর সম্ভব হয়েছে, যা নিজেই ইঙ্গিত দেন— আন্তর্জাতিক মহলও কাবুলের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সংলাপের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। আফগানিস্তান আজ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণেই ভারত চায় না এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্য কোনও চরমপন্থী ছায়ায় ঢেকে যাক।
এতদসত্ত্বেও ভারতের অবস্থান স্পষ্ট— কাবুলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ স্বীকৃতির প্রশ্নে দেশটি সতর্ক।
রাজনীতি, নিরাপত্তা ও মানবতার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের সময়েই মুত্তাকির সফর। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। যদি এই আলোচনা পরস্পরের বোঝাপড়া এবং স্থিতিশীলতার পথে সামান্যও অগ্রগতি আনে, তবে সেটিই হবে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রজ্ঞার বিজয়।
ছবি: সংগৃহীত।