২০২৬ সালে আরও প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী সিরিয়ায় ফিরতে পারেন: জাতিসংঘ
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ২০২৬ সালে প্রায় ১০ লাখ সিরীয় শরণার্থী নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ায় যে ধীরগতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় এই প্রত্যাবর্তন ঘটবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সিরিয়ায় ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি গনজালো ভার্গাস ইয়োসা জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ লাখ সিরীয় শরণার্থী দেশে ফিরে গেছেন। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত প্রায় ২০ লাখ মানুষও নিজ নিজ এলাকায় ফিরেছেন। সব মিলিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিন মিলিয়নের বেশি সিরীয় ঘরে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন, যদিও দীর্ঘ যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সিরীয় সমাজে দীর্ঘদিনের ভয় ও আতঙ্ক দ্রুত কমে এসেছে এবং তার জায়গায় আশার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, বহু শরণার্থী দীর্ঘ ১৪ বছরের বেশি সময় পর দেশে ফিরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন।
আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা
ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর প্রধানত তুরস্ক, লেবানন ও জর্ডান থেকে শরণার্থীরা সিরিয়ায় ফিরছেন। তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক মানুষ মিসর ও ইরাক থেকেও দেশে ফিরেছেন। সংস্থাটি ধারণা করছে, ২০২৬ সালে আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যাবর্তন করলে দুই বছরের মধ্যে মোট ফেরত আসা সিরীয়ের সংখ্যা চার মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে।
ইয়োসা সতর্ক করে বলেন, এত বড় পরিসরে প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ঘটছে। স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং মানবিক সংকট এড়াতে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি।
তুরস্কের ভূমিকা ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা
তিনি শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে নতুন সিরীয় সরকারের প্রতি তুরস্কের সমর্থনকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, তুরস্কের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা সিরিয়ায় বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
দীর্ঘ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া
ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি বলেন, ১৪ বছরের সংঘাতের পর সিরিয়ার পুনরুদ্ধার একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও অবকাঠামো দ্রুত স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব নয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
তিনি আরও জানান, সংস্থাটি ও তাদের অংশীদাররা প্রত্যাবর্তনকারীদের নথিপত্র পুনরুদ্ধারে সহায়তা দিচ্ছে। কারণ, ফিরে আসা মানুষের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র—যেমন পরিচয়পত্র বা সম্পত্তির দলিল—হারিয়ে ফেলেছেন।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নতুন সম্ভাবনা
সিরিয়ার পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে এবং পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কার্যক্রম গতি পাবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইনের আওতায় ‘সিজার আইন’-এর অধীনে আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। সিরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমবে এবং দেশটি নতুন করে স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে পারবে।
সব মিলিয়ে, ব্যাপক হারে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন সিরিয়ার জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও টেকসই উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সময়—দুটোই অপরিহার্য বলে মনে করছে জাতিসংঘ।