Tranding

গাজাতে যুদ্ধ বিরতিতে প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণ

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে...

শান্তি চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে কে জিতল, কে হারল? 

আমরা অনেক ক্যাচালে না গিয়ে দুইটা সহজ প্যারামিটার দেখি। 

এক; কোন পক্ষে উৎসব হচ্ছে? 

যে পক্ষে উৎসব হচ্ছে, ধরে নেওয়া যায় তারা খুশি এবং নিজেদেরকে বিজয়ী মনে করছে। 

এই প্যারামিটারে দেখলে দেখব ফিলিস্তিনিরা উল্লাস করছে। সাংবাদিকরা হেঁটে হেঁটে অন্ধকার রাতে মানুষকে শান্তিচুক্তির সুসংবাদ দিচ্ছে। 

অপরদিকে ইজরাইলিদের ভেতর নেমে এসেছে কবরের নিস্তব্ধতা। শুধু হোস্টেজদের আত্মীয়-স্বজন স্বজনদের মুক্তির আশায় খুশি। সেটা যুদ্ধজয়ের খুশি না। 

যুদ্ধজয়ের ড্রামা একমাত্র বাজিয়ে যাচ্ছে জেনোসাইডার, ওয়ার ক্রিমিনাল নেতানিয়াহু। কিন্তু সেটা তার সেনাবাহিনি, তার মন্ত্রীসভার কেউই বিশ্বাস করছে না। সাধারণ ইজরাইলিদের কথা নাই বা বললাম। 

ফিলিস্তিনিদের খুশিও খাবার পাবে, চিকিৎসা পাবে, ঘরে ফিরতে পারবে, এই সেন্সে; যুদ্ধজয়ের সেন্সে না–এই তর্ক তোলা যেতেই পারে। 

সেক্ষেত্রে আমরা দ্বিতীয় প্যারামিটারে যাই। 

দুই; কোন পক্ষের যুদ্ধের লক্ষ্য কী ছিল? 

হামাসের প্রধান লক্ষ্য ছিল- 

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নেতানিয়াহু জাতিসংঘের ভাষণে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের একটা মানচিত্র দেখায়, যেখানে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন বলে কোনো ভূখণ্ড নাই। 

অর্থাৎ ফিলিস্তিন অতীত। আরবদের, বিশ্বমোড়লদের, ইজরাইলের কেউ-ই মনে করছে না এখানে ফিলিস্তিন নামে কোনো ভূখণ্ড আছে। ফিলিস্তিনি নামে ৫ হাজার বছরের পুরোনো একটা জাতিগোষ্ঠি আছে। 

হামাসের মূল লক্ষ্য ছিল-ফিলিস্তিনকে ফিরিয়ে আনা; আরবদের মুখে, বিশ্বমোড়লদের মুখে, এমনকি ইজরাইলিদের মুখে। 

এই উদ্দেশ্য কী সাধিত হয়েছে? হ্যাঁ, হয়েছে। 

১০০ তে ১০০০ পার্সেন্ট হয়েছে। 

যেখানে আরব শাসকরা, এমনকি দেশভেদে আমজনতা পর্যন্ত ফিলিস্তিনকে বলি দিতে, ফিলিস্তিনকে মুছে দিতে রাজি হয়ে গিয়েছিল, সেখানে দুইবছর পর আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, জন্মের পর থেকে জায়োনিজমের একনিষ্ঠ সমর্থক, বরং সঠিক শব্দে বললে জায়োনিজমের জন্মদাতারা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

যেসব রাষ্ট্রের উদরে জায়োনিজম আর ইজরাইলের জন্ম, সেসব রাষ্ট্রের রাজপথ মুখরিত ফিলিস্তিনের স্লোগানে। 

ফিলিস্তিন মুছে যাওয়ার পরিবর্তে বরং গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। 

পুরো দুনিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ ডজন ডজন ডজন নৌকা নিয়ে ফিলিস্তিনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ক্রমাগত, একের পর এক। 

পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন, প্রতিঘণ্টায় ফিলিস্তিনের নামে স্লোগান দিচ্ছে। 

সারা পৃথিবীতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে-ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি, প্যালেস্টাইন উইল বি ফ্রি। 

সো, ইজরাইল কি ফিলিস্তিনকে মুছে দিতে পেরেছে? পারেনি। 

মুছে দিতে চেয়েছিল? হ্যাঁ, চেয়েছিল। 

সারা দুনিয়ার শত কোটি মানুষ এখন ফিলিস্তিনকে হৃদয়ে ধারণ করে। ফিলিস্তিন ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। ফিলিস্তিন এখন আর মধ্যপ্রাচ্যে নয়, শত কোটি মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়। 

অপরদিকে ইজরাইলের অবস্থা যদি দেখি–

দেশটা আজকে পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। ইজরাইলিরা ঘুরতে গেলে রেস্টুরেন্ট মালিক খাবার দেয় না। স্থানীয়রা দৌড়ানি দেয়। সেই চাপে কর্পোরেট শয়তানগুলো পর্যন্ত মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে। 

হামাসের দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল-সো কল্ড আব্রাহাম একর্ড বন্ধ করা। 

সেটা কি বন্ধ হয়েছে? হ্যাঁ, হয়েছে। 

হামাস জানত ফিলিস্তিনিরা আগেও পরাধীন ছিল, এখনো পরাধীন থাকবে। আগেও পৃথিবীর সর্ববৃহত উন্মুক্ত কারাগারে ছিল, এখনো থাকবে। তাদের প্রাপ্তির কিছু নাই, কিন্তু হারানোর ছিল। 

জোব্বা পরা, স্লামালিকুম ইয়া হাবিবি বলা, অতি নীচ, অতি নগণ্য স্বার্থের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া আরব শাসকদের কম্প্রোমাইজের পরও ফিলিস্তিনকে ‘হারিয়ে যাওয়া’ থেকে রক্ষা করতে পেরেছে। 

পক্ষান্তরে ইজরাইলের লক্ষ্য কী কী ছিল? 

এক; বন্দিদের মুক্ত করা। 

তারা কি সেটা পেরেছে? পারেনি। 

দুই; হামাসকে নির্মূল করা। 

এটাও পেরেছে? পারেনি। 

বরং সমস্ত হিসাব বলছে যুদ্ধের প্রথম দিন হামাসের যে পরিমাণ সদস্য ছিল, আজকের দিন পর্যন্ত ঠিক সে পরিমাণই আছে। কিছু কিছু হিসাব বলছে সংখ্যাটা বেশিও হতে পারে। 

তবে হ্যাঁ, হামাসের ক্ষমতা–স্পেশালি রকেটের মত কিছু ক্ষেত্রে–খর্ব হয়েছে। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে হামাস আরও দুইবছর টিকে থাকতে পারবে। এমনকি সেটা যদি দুই দশক হয়, তবুও। 

তিন; গাজাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেন সেটা আর কোনোদিন ইজরাইলের জন্য হুমকি না হয়। 

ইজরাইলের এই উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে? এখনো নয়। ভবিষ্যতে হবে কিনা, সেটা ভবিষ্যতই বলে দিবে। 

এই যুদ্ধের আগে, অর্থাৎ যদি আমরা ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবরে ফিরে যাই তাহলে দেখতে পাব–

পুরো পৃথিবী মনে করে ইজরাইল এই দুনিয়ার বাপ-মা। 

তাদের সেনাবাহিনি অপরাজেয়। 

তাদের টেকনোলজি বিশ্বসেরা। 

তাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর ক্ষমতা দুনিয়ার কারো নাই। 

তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়ে মাস-সপ্তাহ তো বহুদূর, কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টাও কেউ টিকতে পারবে না। ইজরাইলিরা পৃথিবীর সবচাইতে সুখী জাতি। 

আজকে, ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর কী দেখতে পাচ্ছি? 

সারা পৃথিবী জানে ইজরাইল একটা গণহত্যাকারী রাষ্ট্র। 

ইজরাইলিরা পৃথিবীর নৃসংশতম, বর্বরতম, অসভ্যতম জাতি। 

অভিশপ্ত। পরিত্যক্ত। 

ইজরাইলের টেকনোলজি নারী আর শিশুদের হত্যার ক্ষেত্রে পারফেক্ট বটে। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধে সেটা মাকড়সার জালের মতই। 

২০ বছর ধরে অবরুদ্ধ, ক্ষুধার্ত, অস্ত্রহীন একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠি টানা ২ বছর ধরে ইজরাইলের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারে, এমনকি শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তিতে বসতে বাধ্য করতে পারে; ৬ ই অক্টোবর এটা অবিশ্বাস্য ঠেকে থাকতে পারে, কিন্তু আজকের পৃথিবীতে এটাই ধ্রুব সত্য। এটাই বাস্তব। 

ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি,

প্যালেস্টাইন উইল বি ফ্রি

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.