ইসলামী অনুষ্ঠানে আত্মশুদ্ধি না লোকদেখানো?
বর্তমান সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা চোখে পড়ছে—দীনী পরিবেশে সংগঠিত ইসলামিক প্রোগ্রামগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আত্মশুদ্ধির মাধ্যম না হয়ে পরিণত হচ্ছে বাহ্যিক প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতার ময়দানে। ইখলাস, তাকওয়া ও বিনয়-নম্রতার বদলে সেখানে দেখা যাচ্ছে মোবাইল হাতে সেলফি তোলা, ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের হিড়িক। যেন মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কে কার প্রোগ্রামে গিয়েছে, কারা মঞ্চে বসেছে, কার সাথে ছবি তোলা হয়েছে—এসব দেখিয়ে সামাজিক মর্যাদার এক কৃত্রিম মঞ্চ নির্মাণ করা।
এই প্রবণতা শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং শরীয়তের মৌলিক চেতনারও পরিপন্থী। আমাদের আকাবিরগণ, সালাফে সালেহীনগণ ইসলামী সমাবেশগুলোকে বানিয়েছিলেন তাকওয়া, বিনয় এবং আত্মসমালোচনার এক অফুরন্ত উৎস। তাঁরা যেখানেই বসেছেন, সেখানে ছিল গভীর ভাবনা, হৃদয় নিংড়ানো তাওবা আর আল্লাহর ভয়ে নিভৃত অশ্রুপাত। কিন্তু আজ অনেক ক্ষেত্রেই সেই আত্মশুদ্ধির মাঠটি পরিণত হয়েছে বাহ্যিক আড়ম্বর ও আত্মপ্রচারের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই প্রবণতা সম্পর্কে বহু পূর্বেই সতর্ক করে গেছেন:
«مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ، وَمَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللَّهُ بِهِ»
“যে লোকদের শোনানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তাকে লোকদের সামনে লাঞ্ছিত করবেন। আর যে লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তার রিয়ার (লোক দেখানো আমল) ফাঁস করে দিবেন।”
(সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
এই হাদীস আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, লোকদেখানো আমল শুধু অগ্রহণযোগ্য নয়, বরং তা একদিন অপমান ও লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ইখলাস ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না, বরং তা হতে পারে ধ্বংসের মাধ্যম।
তাই আজ আমাদের চিন্তা করা দরকার—আমরা কেন ইসলামী প্রোগ্রামে যাচ্ছি? সেখানে কি আমরা তাকওয়া ও ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি, নাকি ছবি তুলে স্ট্যাটাস দেবার জন্য? আমাদের অভিপ্রায় কি ইখলাসভিত্তিক? নাকি লোক দেখানোর লোভে কলুষিত?
আমাদের করণীয়
ইসলামী প্রোগ্রামগুলোকে বানাতে হবে আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র।
অনুষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নির্ধারিত হওয়া উচিত ইলম, ইখলাস ও সুন্নাহর আলোকে।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে থাকা উচিত বিনয়, নীরবতা ও শ্রদ্ধাবোধ।
প্রোগ্রামের পরিবেশ যেন না হয় আলো-ঝলমলে শো-ডাউন, বরং হয় আল্লাহভীতির বাতিঘর।
স্মরণ রাখা উচিত, দীন কোনো বিনোদনের উপকরণ নয়। এটা আমাদের হিদায়াতের পথ, আত্মার পরিশুদ্ধির যাত্রা এবং পরকালীন সফলতার সোপান।
আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করি—আমার দীন চর্চা কি আল্লাহর জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য? যদি আল্লাহর জন্য হয়, তবে সেটাই আমাদের মুক্তির পথ।
আল্লাহ আমাদের সকলকে রিয়া ও লোক দেখানোর শির্ক থেকে হিফাযত করুন, এবং আমাদের আমলগুলো যেন হয় শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য—এই দোয়া করি। আমিন।