দিল্লির স্কুল টেক্সটবুকে ভাজপার ‘নয়া ইতিহাস’: স্বাধীনতা সংগ্রামে নেই মহাত্মা গান্ধি , ‘নায়ক’ আরএসএস
নিজস্ব প্রতিবেদন | নয়াদিল্লি | ৫ অক্টোবর ২০২৫
দিল্লির স্কুলের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিজেপি-শাসিত সরকার নতুন করে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস পুনর্লিখনের উদ্যোগ নিয়েছে। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির নতুন ইতিহাস বইতে দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের অধ্যায়ে নেই মহাত্মা গান্ধির নাম, নেই কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন অহিংস আন্দোলনের বিশদ আলোচনা। বরং সেখানে প্রধান নায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ও নেতাদের— কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর, এবং বিনায়ক দামোদর সাভারকর।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই নতুন পাঠ্যক্রমে বলা হয়েছে যে, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলির মধ্যে আরএসএসের ভূমিকা ছিল “মূল এবং প্রেরণাদায়ক।” একাধিক অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে— “স্বাধীনতার চেতনা” গড়ে তুলতে আরএসএসের ভূমিকা অপরিসীম ছিল। এমনকি “দেশভক্ত যুবকদের সংগঠিত করা ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় গর্ব জাগানো”য় সংঘের অবদান বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইতিহাসবিদদের তীব্র সমালোচনা
এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ ইতিহাসবিদ মহল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা একে “ইতিহাস বিকৃতি” বলে মন্তব্য করেছেন। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার বলেন,
“আরএসএস স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয়নি। বরং তারা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিল। এখন তাদের স্বাধীনতার নায়ক বানানো হচ্ছে — এটা ইতিহাস নয়, রাজনৈতিক প্রচার।”
অন্য ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের মতে,
“এই পাঠ্যপুস্তকগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করবে। ভারতের স্বাধীনতা গান্ধি, নেতাজি, ভগৎ সিং, এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগে অর্জিত। এই সত্য কোনওভাবেই পরিবর্তন করা যায় না।”
সরকারি অবস্থান
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, “নতুন পাঠ্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো তরুণ প্রজন্মকে জাতীয়তাবাদের প্রকৃত উৎস ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি সম্পর্কে সচেতন করা।” মন্ত্রকের এক মুখপাত্র বলেন,
“স্বাধীনতার ইতিহাসে বহু অবহেলিত ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনের নাম ইতিহাসে স্থান পায়নি। আমরা সেই শূন্যতা পূরণ করছি।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ লেখেন,
“গান্ধীজির ভূমিকা মুছে দিয়ে আরএসএসকে নায়ক বানানো মানে ভারতের আত্মাকে বিকৃত করা। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস রাজনৈতিক মতাদর্শে নয়, সত্যে লেখা উচিত।”
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র বলেন,
“বিজেপি ইতিহাস নয়, মতবাদ পড়াচ্ছে। শিশুরা সত্যের পরিবর্তে প্রচার শিখবে — এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা।”
উপসংহার
শিক্ষাবিদরা সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের পুনর্লিখন শিক্ষার মান ও ঐতিহাসিক সত্য উভয়ের উপরেই গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাস শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতের ভিত্তি — তাই ইতিহাসের বিকৃতি ভবিষ্যতের প্রজন্মের চিন্তাধারাকেও বদলে দিতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।