আওয়ামী লীগ আমলে মানিকগঞ্জে দমন-পীড়নের শিকার বিএনপি-জামায়াত
অনলাইন বঙ্গদর্পণ : স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও ২০০৮ বাংলাদেশের নির্বাচন পরবর্তীতে জেলার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আওয়ামী লীগের হাতে। এর পর থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর শুরু হয় দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হয়রানি।
গত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এই জেলায় অন্তত নয়জন বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন অনেকে, যাদের মধ্যে অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। একই সময়ে এই জেলায় ২৫১টি গায়েবি মামলায় আসামি করা হয় প্রায় ১১ হাজার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে।
হত্যার শিকার বিরোধী কর্মীরা
২০১৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি হেফাজত ইসলাম ও সমমনা দলের হরতাল সমর্থনে মানিকগঞ্জ-সিঙ্গাইর-হেমায়েতপুর সড়কের গোবিন্দল এলাকায় মিছিল চলাকালে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের হামলায় নিহত হন চারজন—নাজিম উদ্দিন মোল্লা, নাসির উদ্দিন, আলমগীর হোসেন ও শাহ আলম। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন আরও ৩৬ জন।
২০২৪ সালের আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আরও পাঁচজন—শিবালয়ের রফিকুল ইসলাম, সিংগাইরের সাদ মাহমুদ খান, হরিরামপুরের মহিউদ্দিন মোল্লা, সাটুরিয়ার আফিকুল ইসলাম সাদ এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার শফিক উদ্দিন আহমেদ।
গায়েবি মামলা ও হয়রানি
বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গত সাড়ে ১৬ বছরে দায়ের হয় প্রায় ২৫১টি মামলা। এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় প্রায় ১১ হাজার কর্মীকে। অনেকেই বছরের পর বছর আদালত ও কারাগারের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছেন। কেউ কেউ একাধিকবার রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
রাজনৈতিক হামলা ও নির্বাচনী সহিংসতা
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলার তিন আসনের বিএনপি প্রার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। বিশেষ করে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা নির্বাচনী প্রচারণায় গেলে যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা তার গাড়িবহরে হামলা চালায়।
স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী নেতাদের দৌরাত্ম্য
মানিকগঞ্জের তিন আসনেই গত দেড় যুগে এমপি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে।
মানিকগঞ্জ-১ আসনে প্রভাব বিস্তার করেন সাবেক ক্রিকেটার নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও তার পরিবার।
মানিকগঞ্জ-২ আসনে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে সাংসদ মমতাজ বেগম ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও তার পরিবারকে ঘিরে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা পরিবহন, বালুমহাল ও জমি দখলসহ নানা খাতে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
বিরোধী দলের বক্তব্য
মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা বলেন, “গায়েবি মামলার মাধ্যমে বিরোধী দলকে দমন করা ছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করা এবং জনগণের কণ্ঠস্বর রোধ করা হয়েছে।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর মানিকগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, আওয়ামী আমলে প্রভাবশালী নেতারা বালুমহাল, পরিবহন ও টেন্ডার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তিনি এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। সার্বিকভাবে, বিরোধী দলের দাবি—আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দমননীতি মানিকগঞ্জে রাজনৈতিক সহাবস্থান নষ্ট করেছে, আর নির্যাতনের দাগ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন হাজারো পরিবার।