গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বাড়ছে: ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগে অক্ষম মধ্যস্থতাকারীরা—হামাসের অভিযোগ
গাজায় ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরেও ইসরায়েলের অব্যাহত লঙ্ঘন পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগে থাকা হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠনের নেতারা বলছেন, মধ্যস্থতাকারীরা ইসরায়েলকে চুক্তির শর্ত মানাতে পারছে না, ফলে ইসরায়েল ইচ্ছেমতো আচরণ করছে এবং নিজেদের ‘সবার ঊর্ধ্বে’ মনে করে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলের প্রতিদিনের লঙ্ঘন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে। তবুও ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে ঐকমত্য—গাজায় আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হোক, তা কোনোভাবেই চায় না। তাই তারা সাময়িক আক্রমণগুলো সহনীয় সীমায় রাখার চেষ্টা করছে এবং সমাধান খুঁজছে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে।
যুদ্ধ ফের শুরু হওয়ার আশঙ্কা: হামাস–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে উসকে দিতে চায়, যাতে হামাস প্রতিক্রিয়া জানায় এবং অঞ্চল আবার যুদ্ধে ফিরে যায়। এতে রাজনৈতিক সংকটে থাকা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার টিকে থাকার সুযোগ পেতে পারে।
মধ্যস্থতাকারীদের সীমাবদ্ধতা: নেতারা অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী ও যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় চাপ সৃষ্টি করলেও বেশির ভাগ সময়ে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়ের বেশ কিছু চুক্তি যেমন—দ্রুত ত্রাণ সরবরাহ, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি—ইসরায়েল এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি।
দ্বিতীয় পর্যায়ে অগ্রগতি নেই: হামাস জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে যেতে প্রস্তুত; কিন্তু ইসরায়েল নানা শর্ত আরোপ করছে—যেমন প্রতিরোধ বাহিনীর অস্ত্রের ভবিষ্যৎ, কে গাজা শাসন করবে, এবং পুনর্গঠন কোন এলাকায় আগে হবে—এসব প্রশ্নে চাপ সৃষ্টি করছে। এদিকে, ইসরায়েল দাবি করছে—গাজায় নিহত দুই ইসরায়েলি বন্দীর দেহ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় ধাপে যাবে না। ফিলিস্তিনি পক্ষ বলছে, ইসরায়েলি অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিহত হওয়ায় দেহ খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে।
পুনর্গঠনে দ্বিমত: যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যৌথভাবে রাফাহর ইসরায়েল–নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পুনর্গঠন শুরু করতে চাইছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানায়নি হামাস। ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোর বক্তব্য—যে কোনো পুনর্গঠন অবশ্যই পুরো গাজা জুড়ে হতে হবে, আলাদা এলাকায় নয়।
মাঠপর্যায়ে সহিংসতা—শিশুসহ নিহত: শনিবার ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় খান ইউনুসে দুই ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। তারা পরিবারের জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে ‘হলুদ সীমারেখা’ অতিক্রম করলে ড্রোন তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি লঙ্ঘনে কমপক্ষে ৩৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই দিনে রাফাহ, খান ইউনুস, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ এবং ড্রোন আক্রমণ অব্যাহত ছিল।
মানবিক সংকট আরও ঘনভূত: ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, ত্রাণ প্রবেশে কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি, বরং অধিকাংশ ট্রাক বাণিজ্যিক, যা সাধারণ মানুষকে কিনে নিতে হয়। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলেছে—গাজায় অপুষ্টি ও শীতপ্রবাহ শিশুদের জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করছে। অক্টোবর মাসে ৫ বছরের নিচে প্রায় ৯৩০০ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।
সংস্থাটি সব পক্ষকে গাজার সব প্রবেশদ্বার খুলে মানবিক সহায়তা দ্রুত প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে।