ইসরায়েলকে অর্থ-অস্ত্রে জোগাচ্ছে যেসব দেশ
গাজায় গণহত্যামূলক আগ্রাসন তৃতীয় বছরে|
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৫;ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক আগ্রাসন চলছে টানা তৃতীয় বছরে। এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে শিশু ২০ হাজারেরও বেশি। ধ্বংস হয়েছে ১২৫টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, ৯২ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় সব আবাসিক ভবন। জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা এ হামলাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
তবে এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্র থেমে নেই। বরং একাধিক দেশ ও প্রতিরক্ষা কোম্পানির আর্থিক ও সামরিক সহায়তায় তা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র: প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী ও মিত্র
ওয়াশিংটন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র জোগানদাতা এবং কূটনৈতিক রক্ষাকবচ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে একাধিকবার ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
বর্তমানে ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন বার্ষিক সামরিক সহায়তার পরিমাণ ৩.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে। এর বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সরাসরি সহায়তা হিসেবে পাঠিয়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ। বিশ্লেষকদের অনুমান, অনুমোদিত চুক্তিসহ এই সহায়তা ২২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এর মধ্যে আছে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, শহরযুদ্ধের যান, ডেস্ট্রয়ারের যন্ত্রাংশ, হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন বোমা ও গাইডেন্স কিট।
অস্ত্র সরবরাহে সক্রিয় মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বোয়িং, লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন, নর্থথ্রপ গ্রুম্যান, হানিওয়েল, কলিন্স এয়ারোস্পেস ও জিই অ্যাভিয়েশন।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্ট’ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারত না।
জার্মানি: ইউরোপের শক্তিশালী সরবরাহকারী
সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২০২৪ সালে ইসরায়েলের এক-তৃতীয়াংশ অস্ত্র এসেছে জার্মানি থেকে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত বার্লিন ইসরায়েলে ৪৮৫ মিলিয়ন ইউরোর অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে।
সরবরাহের মধ্যে রয়েছে ফ্রিগেট, টর্পেডো, এবং রাইনমেটাল কোম্পানির তৈরি ১২০ মিমি ট্যাংক গোলা, যা গাজায় স্থল অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ ছাড়া আ্যাটলাস ইলেকট্রনিক কাজ করছে ইসরায়েলের ডলফিন-ক্লাস সাবমেরিনের রক্ষণাবেক্ষণে, এবং মার্সিডিজ বেঞ্জ সরবরাহ করছে ট্যাংকবাহী ভারী ট্রাক।
ইতালি: হেলিকপ্টার ও নৌ অস্ত্র
২০২০–২০২৪ সালে ইসরায়েলের মোট অস্ত্র আমদানির ১ শতাংশ এসেছে ইতালি থেকে। এর মধ্যে ৫৯ শতাংশ ছিল হালকা হেলিকপ্টার এবং ৪১ শতাংশ নৌ কামান।
আলত্রেকোনোমিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইতালি ইসরায়েলে ৫.২ মিলিয়ন ইউরোর অস্ত্র রপ্তানি করেছে।
যুক্তরাজ্য: দ্বিমুখী অবস্থান
যদিও যুক্তরাজ্য সম্প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে ১ লাখ ১০ হাজার গুলি পাঠিয়েছে লন্ডন। যদিও ৩৫০টি অস্ত্র লাইসেন্সের মধ্যে ৩০টি স্থগিত করা হয়েছে ‘গাজায় ব্যবহারের ঝুঁকি’ বিবেচনায়, বাকি অধিকাংশই বহাল রয়েছে।
অন্যান্য সরবরাহকারী
ইসরায়েলকে অস্ত্র দিচ্ছে আরও কয়েকটি দেশ ও কোম্পানি—
ফ্রান্সের সাফরান: বিমান ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হুনিড টেকনোলজিস: ওয়্যারিং হারনেস ও ককপিট সিস্টেম সরবরাহ করছে।
এক বৈশ্বিক অস্ত্র নেটওয়ার্ক
গাজায় ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু বাড়লেও, ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে বিশ্বের এই বিশাল অস্ত্র সরবরাহ নেটওয়ার্ক। ফলে, এই যুদ্ধ আর কেবল ইসরায়েল ও গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী অর্থ, প্রযুক্তি ও সামরিক স্বার্থের এক নিষ্ঠুর সংমিশ্রণ।