Tranding

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান দারুল উলুম দেওবন্দ : আলহাজ্ব ড. ফিরোজ উদ্দিন মোহাম্মাদ শফী

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে “দারুল উলুম দেওবন্দ” নামটি এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। এটি কেবল একটি ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি ছিল একটি বিপ্লবী চিন্তার কেন্দ্র, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা ও জাতীয় চেতনা একত্রে বিকশিত হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে স্বাধীনতার জাগরণ ঘটাতে দেওবন্দের ভূমিকা ছিল গভীর, ঐতিহাসিক ও অনুপ্রেরণামূলক।

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে (১২৮৩ হিজরি) উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ শহরে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহান আলেম মাওলানা কাসিম নানুতবি, মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী, হাজী আবিদ হুসাইন ও অন্যান্য বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর মুসলমান সমাজে যে মানসিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল, সেই প্রেক্ষাপটে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয়, নৈতিক ও জাতীয় চেতনা পুনরুজ্জীবিত করা এবং শিক্ষার মাধ্যমে তাদের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধার করা।

দেওবন্দ মাদরাসা ছিল ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষার আধার, তবে এর শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ব্রিটিশবিরোধী চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত। এখানে কেবল ধর্মীয় জ্ঞান নয়, বরং রাজনৈতিক সচেতনতা, আত্মনির্ভরতা ও সমাজসেবার পাঠও দেওয়া হতো। শিক্ষক ও ছাত্ররা মনে করতেন যে, ইসলাম শুধু মসজিদের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি।

স্বাধীনতা আন্দোলনে দেওবন্দের ভূমিকা :

দেওবন্দের আলেমগণ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৮৫৭ সালের যুদ্ধের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁরা বুঝেছিলেন যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সংগঠিত প্রচেষ্টা ও জনসচেতনতা জরুরি। মাওলানা কাসিম নানুতবি নিজে ১৮৫৭ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং পরে তিনি শিক্ষার মাধ্যমে আন্দোলনকে এগিয়ে নেন।

দেওবন্দ থেকে উৎপন্ন বহু নেতা পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান (যিনি “শাইখুল হিন্দ” নামে পরিচিত)। তিনি ‘সিল্ক লেটার কনস্পিরেসি’ বা ‘রেশম পত্র ষড়যন্ত্র’-এর নেতৃত্ব দেন, যা ছিল ব্রিটিশবিরোধী এক গোপন বিপ্লবী প্রচেষ্টা। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তুরস্ক, আফগানিস্তান ও জার্মানির সাহায্যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। যদিও এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবুও এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম: 

দেওবন্দের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯১৯ সালে গঠিত হয় জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দ, যা ছিল ভারতের মুসলমান আলেমদের একটি জাতীয় সংগঠন। এই সংগঠন স্পষ্টভাবে ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন-এ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি, মাওলানা আব্দুল কালাম আজাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও শওকত আলী প্রমুখ নেতারা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা ভারতের স্বাধীনতাকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে দেখেছিলেন।

দেওবন্দের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রচার। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “দেশের সকল নাগরিকই ভারত মাতার সন্তান; তাই স্বাধীনতার লড়াই ধর্মনিরপেক্ষভাবে সকলের দায়িত্ব।” তাঁর এই চিন্তাধারা ‘কম্পোজিট ন্যাশনালিজম’ বা যৌথ জাতীয়তাবাদের ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে।

দেওবন্দের আলেমগণ কখনও স্বার্থ বা ক্ষমতার রাজনীতি করেননি। তাঁদের সংগ্রাম ছিল নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমের প্রতীক। অনেক আলেম ব্রিটিশদের হাতে কারারুদ্ধ হন, অনেকে মৃত্যুদণ্ডও ভোগ করেন। তবুও তাঁদের মনোবল ভাঙেনি। তাঁদের শিক্ষা, উপদেশ ও দৃষ্টান্ত পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনুপ্রাণিত করেছে।

দারুল উলুম দেওবন্দ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অদম্য প্রেরণার উৎস। এটি ধর্ম, শিক্ষা ও জাতীয়তার মিলনস্থল যেখানে আলেমরা কেবল ইসলাম প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং জাতীয় মুক্তির আন্দোলনকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দেওবন্দের অবদান শুধু ভারতের ইতিহাসেই নয়, সমগ্র উপমহাদেশের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে অমর হয়ে আছে।

সর্বোপরি, দারুল উলুম দেওবন্দ প্রমাণ করেছে যে সত্যিকারের শিক্ষা শুধু জ্ঞানের আলোই নয়, ন্যায় ও স্বাধীনতার সংগ্রামে জাতিকে জাগিয়ে তোলার শক্তিও প্রদান করে।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.