ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়: এক চিকিৎসক মুখ্যমন্ত্রীর মানবিক মুখ
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে যদি মানবিকতা, দক্ষতা, ও আদর্শ নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতিমূর্তি খুঁজতে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে উঠে আসে একটাই নাম—ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়। তিনি শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন এক যুগান্তকারী চিকিৎসক, শিক্ষক, এবং এক মহান সমাজসেবক। তাঁর জীবনচরিত আজও মানবতার পাঠ শেখায়।
✦ এক কাশির শব্দেই রোগ নির্ণয়
রাইটার্স বিল্ডিং-এ মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে সন্ধ্যার পরে কাজ করা ছিল তাঁর রুটিন। একদিন, অফিস ছাড়ার মুহূর্তে তিনি শুনলেন এক সাফাইকর্মীর কাশির শব্দ। কাশি শুনে থমকে দাঁড়িয়ে তিনি ডেকে পাঠালেন কর্মীটিকে। কর্মী ভয়ে অনুনয় করে বলল, “স্যার, চাকরিটা খাবেন না…” মুখ্যমন্ত্রীর জবাব ছিল, “চাকরিটা পরে, আগে প্রাণে বাঁচো।”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে সার্জেন্টকে নির্দেশ দিলেন, “একে এখনই যাদবপুর টিবি হাসপাতালে পাঠান, ওর গ্যালপিং টিবি হয়েছে।” নির্ধারিত মেডিক্যাল পরীক্ষাতেও ধরা পড়ল গ্যালপিং টিবি। মুখ্যমন্ত্রী নিজে ওষুধ লিখে দিলেন।
এই ঘটনাটি কেবল একজন দক্ষ চিকিৎসকের প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা নয়, একজন মুখ্যমন্ত্রীর অসাধারণ মানবিকতাও প্রকাশ করে।
✦ মুখ্যমন্ত্রী, কিন্তু আগে চিকিৎসক
আরেকদিন, সকাল দশটার সময় মুখ্যমন্ত্রী রাইটার্সে পৌঁছতেই হইচই পড়ে গেল। এক যুবতী কোলে শিশুকে নিয়ে এসে মুখ্যমন্ত্রীর পায়ে পড়ে কাঁদতে লাগল, “আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান…” পুলিশের বারণ সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী কিছু না বলে সোজা উঠে গেলেন তাঁর দপ্তরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিচে নেমে এলেন এবং কড়া নির্দেশ দিলেন, “ডেকে নিয়ে আসুন ওদের।”
তারপর প্রকাশ পেল তাঁর আরও এক মানবিক রূপ। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে শিশুটির পেট পরীক্ষা করলেন। কোনও হুমকি নয়, বরং লিখে দিলেন ওষুধ, বললেন, “ডিসপেনসারি থেকে নিয়ে নাও, টাকা দিতে হবে না। আর হ্যাঁ, এক সপ্তাহ পরে জানিও কেমন আছে। দরকার হলে আমার বাড়িতে এসো, প্রতিদিন সকালে একঘন্টা করে রোগী দেখি।”
এই ঘটনাটি কেবল তাঁর চিকিৎসকের ভূমিকা নয়, একজন জননেতার দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাকেও স্পষ্ট করে।
✦ মানুষের জন্য নিবেদিত এক জীবন
ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের জীবন কেবল রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি তাঁর চিকিৎসা জীবনে ছিলেন চিকিৎসকদের শিক্ষক, রোগীদের ত্রাতা, এবং একজন সংগঠক। তিনি একাধারে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকতা করেছেন এবং একাধিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৃত চিকিৎসক কখনও শুধুই ওষুধ দিয়ে নয়, ভালোবাসা, যত্ন, এবং সহানুভূতির মাধ্যমে রোগীকে সারিয়ে তুলতে পারেন। আর রাজনীতিক হিসেবে তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করতেন মানুষের সেবা করতেই।
✦ পশ্চিমবঙ্গের রূপকার
১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হন ডঃ বিধানচন্দ্র রায়। স্বাধীনতার পর বিধ্বস্ত বাংলাকে পুনর্গঠনের কাজে তিনি নেতৃত্ব দেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তাঁর সময়ে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও নগর উন্নয়নে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা আজও স্মরণীয়। তাঁর পরিকল্পনায় গড়ে ওঠে দুর্গাপুর, কালীঘাট, আসানসোল, বিধাননগরের মতো শহর।
তিনি ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর অনুগামী, এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূলে ছিল সেবাই পরম ধর্ম।
✦ সম্মান ও স্মৃতি
ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারত রত্ন-এ ভূষিত করে। তাঁর জন্মদিন ১লা জুলাই আজও জাতীয় চিকিৎসক দিবস হিসেবে পালিত হয়, চিকিৎসকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
✦ উপসংহার
ডঃ বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি রাজনীতি ও চিকিৎসাকে এক সুতোয় বেঁধে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। রাইটার্স বিল্ডিং-এর করিডোরে দাঁড়িয়ে হোক বা সাধারণ মানুষের ভিড়ে, তিনি কখনও মুখ্যমন্ত্রী, কখনও চিকিৎসক—সবচেয়ে বড় কথা, একজন মানবিক মানুষ ছিলেন। তাঁর মতো মানুষের প্রয়োজন আজও সমাজে প্রবলভাবে অনুভূত হয়।
ডঃ বিধানচন্দ্র রায় শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রী নন—তিনি ছিলেন বাংলার বিবেক।