সম্পাদকীয়: যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে পূর্বমুখী হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং তাদের নিরাপত্তা গ্যারান্টির বিষয়টি দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্প্রতি, কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের হামাস নেতাদের উপর হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। এই হামলা শুধু কাতার নয়, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও কাতার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত, তবুও এই হামলা বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, সুরক্ষিত থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই, এমনকি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার পরেও।
এ ঘটনার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কাতারের মধ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও, ইসরাইল কাতারের ওপর হামলা চালানোর সাহস দেখিয়েছে। এই পরিস্থিতি কাতারের সরকারকে এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বাধ্য করেছে, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব পর্যালোচনা করার কথা ভাবছে। এক্ষেত্রে কাতার অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প খুঁজে বের করার কথা বলছে, যা তাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
এমনকি পাকিস্তান, যা মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে সম্ভাব্য গ্যারান্টর হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। পাকিস্তান দীর্ঘ সময় ধরে আরব দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে এবং তাদের যুদ্ধ অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে, পাকিস্তানকে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া, উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে চীনের সম্পর্কও ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার, এবং চীনের সমর্থনে একাধিক আর্থিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে। ইসরাইলের আক্রমণের পর, চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেছে এবং কাতারের প্রতি সমর্থন জানায়। এই পরিস্থিতিতে চীন এবং পাকিস্তান, দুটি শক্তিশালী দেশ, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা গ্যারান্টর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের সামরিক উপস্থিতি এখন পর্যন্ত সীমিত, তবে এটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, ভবিষ্যতে চীন উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক নিরাপত্তায় নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করবে। কাতারের আল-উদেইদে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির মতোই, চীনের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা বাড়ছে। চীনের নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়তে সাহায্য করবে, যা বহুমুখী বিশ্বরাজনীতির আরেকটি প্রতিফলন হতে পারে।
এখনো সময় রয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিজেদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি পুনঃমূল্যায়ন করার এবং একটি নতুন সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করার। নিরাপত্তা জটিলতার মধ্যে, নিজেদের পক্ষ থেকে চীন ও পাকিস্তান, কিংবা অন্য কোনো শক্তির সাহায্য নেয়ার সিদ্ধান্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।