সম্পাদকীয়: মুসলিম ওবিসি সংরক্ষণ: নীরবতার রাজনীতি আর বঞ্চনার চক্র
রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন ও সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজ যখন সংরক্ষণের দাবিতে উত্তাল, তখন সেই আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিল এসআইও। তাদের পাশে ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনসহ আরও বহু সংগঠন। সে সময় কলম, গতি, মীযান, জনতার আদালত, বাংলার রেনেসাঁ–র মতো গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তায় লিখে চলেছিল। সাচার কমিটির রিপোর্ট নিয়ে বিশ্লেষণ, আলোচনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র।
চাপ বাড়লে বামফ্রন্ট সরকার বাধ্য হয় এমএসকে চালু করতে, এবং ঘোষণাও করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মুসলিমদের জন্য ওবিসি সংরক্ষণ। কিন্তু তখন জনরোষ এতটাই তীব্র ছিল যে সেই সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তের প্রতিষেধক হয়েই রয়ে যায়।
তথাপি সংরক্ষণের ফলে বহু মুসলিম ছেলে-মেয়ে চাকরি পেয়েছেন, পঞ্চায়েতে সদস্য হয়েছেন। কিন্তু এই সাফল্যের অন্তরালে চলছিল অন্য খেলা—যার খোঁজ মুসলিম নেতৃত্বের বড় অংশ পাননি বা পেতে চাননি। ভোট চাইতে তারা এসেছেন, অন্য দলের বিপদ দেখাতে তারা সক্রিয় থেকেছেন, কিন্তু সংরক্ষণ নিয়ে সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তে তারা নীরব থেকেছেন। এমনকি ওবিসি সুবিধা হঠাৎ কমে যাওয়ার সময়ও তাদের কণ্ঠে কোনো প্রতিবাদ শোনা যায়নি। এরা যেন কেবল ভোটের আগেই জেগে ওঠা মোড়ল—যাদের নীরবতা আজ প্রশ্নের মুখে।
এই অবস্থায় উচ্চশিক্ষিত একদল মুসলিম যুবক-যুবতী এগিয়ে এলেন। সরাসরি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন—ওবিসি তালিকা তৈরিতে ভুল হচ্ছে। তাঁদের আন্দোলনের চাপে সরকার নড়েচড়ে বসে, আইনি লড়াইও করে। কিন্তু তৈরিকৃত নতুন তালিকা এমনভাবে সাজানো হয় যে আগের তালিকায় ব্যাপক রদবদল ঘটে। ফল—মুসলিম সমাজ সার্টিফিকেট পেলেও চাকরি পেল না। নতুন আবেদন প্রায় বন্ধ। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি চাকরি—সব জায়গা থেকে উঠছে বঞ্চনার অভিযোগ।
শাসক দলের নেতারা আবার আশ্বাস দেন—“সব ঠিক হয়ে যাবে, সমস্যা একে একে মিটছে।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো— সমস্যা তৈরি হলো কেন? আগের কার্যকর ওবিসি তালিকা বাদ দেওয়ার প্রয়োজনই বা কী ছিল?
এই তালিকা তৈরির সময় মুসলিম ওবিসি নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অন্ধকারে।
এ সময়ে ছাত্র সংগঠন এসআইও বিধানসভা অভিযান করেছে। আরও রাজনৈতিক সংগঠন রাস্তায় নামছে—এ অবশ্যই ইতিবাচক লক্ষণ। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—
শাসক দলের মুসলিম ওবিসি নেতৃত্ব আজও নীরব। কেন? কাকে ভয়? কোন পদ এত মূল্যবান যে সমাজের স্বার্থে মুখ খুলতেও তাদের বাধে?
আর বিরোধীরা? সিপিআইএম, কংগ্রেস, বাম দলগুলো—তারা কেন এই ইস্যুতে প্রায় নিশ্চুপ? সংখ্যালঘুদের বঞ্চনা কি তাদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বাইরে? নাকি ভেতরে ভেতরে সবাই একই খেলায় যুক্ত?
একটি সম্প্রদায়কে পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। সংরক্ষণ কোনো দয়া নয়—এটি সাংবিধানিক অধিকার। আর সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিপক্ষে কথা বলতে না পারা নেতৃত্ব মানে কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়—এটি আত্মসমর্পণ।
আজ প্রশ্ন একটাই— মুসলিম সমাজের বঞ্চনার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখবে কে?নীরবতা ভাঙবে কে?