Tranding

সম্পাদকীয়: সম্প্রীতির রাজনীতি ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সম্প্রতি এমন এক ধারণা তৈরি হচ্ছে যেন কেবলমাত্র কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে পাশে রেখে বা কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে সামনে বসিয়ে নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ক নিশ্চিত করা যায়। বিশেষত মুসলিম ভোটকে ‘নিশ্চিত’ ধরে চলা—এমন মনোভাব যে ভ্রান্ত, তা শাসক দলকে আরও স্পষ্ট করে বুঝতে হবে।

ধর্মীয় মেরুকরণকে ব্যবহার করে সাময়িক রাজনৈতিক লাভ হয়তো সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সামাজিক ভাঙন ডেকে আনে। তাই সাম্প্রদায়িকতার লাগাম টানা আজ সরকারের প্রথম দায়িত্ব। একই সঙ্গে দলের মধ্যে যেসব নেতানেত্রী বিজেপির সঙ্গে অস্বচ্ছ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন, তাদের প্রতি কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্য দল থেকে আসা নেতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা ‘জামাই আদর’-এর প্রবণতাও দলকে দুর্বল করে।

দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধী কণ্ঠ—নওসাদ সিদ্দিকী বা হুমায়ুন কবিরের মতো—তাদের বক্তব্যকে শুধুই ‘বিরোধিতা’ বা ‘দালালি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। তাদের অভিযোগগুলিও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বিচার করা উচিত। গণতন্ত্রে প্রতিটি সমালোচনা মূল্যবান; সমালোচনাকে দমন করার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত দলের ক্ষতিই ডেকে আনে।

অনেকে মনে করছেন, হিন্দু ভোট খোয়া যাওয়ার ভয়ে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে সরাসরি অবস্থান না নেওয়াই নিরাপদ কৌশল। কিন্তু এই ধারণাও ভুল। হিন্দু সম্প্রদায় সমগ্রটিকে সাম্প্রদায়িক বলে চিহ্নিত করা অন্যায়, এবং বাংলার মাটি কখনোই এমন মনোভঙ্গির ছিল না। সম্প্রীতির ভার বহন করার দায়িত্ব যেমন মুসলমানদের নয়, তেমনই হিন্দুদের একারও নয়—এ দায়িত্ব সরকারকেই প্রথমে নিতে হবে। তারপর দায়িত্ব আসে দুই সম্প্রদায়ের নাগরিকদের উপর।

২০২১ সালে মুসলিম ভোটাররা, আলাদা ‘মুসলিম দল’ থাকার পরও, সাংঘাতিক মেরুকরণের সময়ে বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন—এ এক ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা। এবার ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে এই সামাজিক প্রতিশ্রুতির প্রতিদান দিতে হবে শাসকদলের সেই নেতাদের, যারা সংখ্যাগুরু পরিচয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন। বিজেপিকে প্রতিহত করার দায় মুসলমানদের কাঁধে চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং এই দায়িত্ব প্রথমে দলীয় নেতৃত্বেরই।

যদি সরকার এবং দলের নেতৃত্ব এই বার্তা না বোঝেন, তবে বাংলার মুসলমানরা নিশ্চুপে সব মেনে নেবেন—এমন ভ্রান্ত ধারণা রাখা বিপজ্জনক। ইতিহাস বলছে, বাংলার মানুষ প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের পথ নিজেই ঠিক করেন। তাঁদের মনোভাবকে যেন আবার সেই প্রাচীন প্রবাদের মতোই শোনায়—

“সাগরে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কি ভয়!”

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.