সম্পাদকীয়: শফিকুল ইসলামের বাড়ি ঘেরাও: আবেগ নয়, যুক্তি ও আইনের পথে চলুন
সম্প্রতি আরামবাগ টিভির শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এমন অবস্থায় প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মন দগদগে হওয়া স্বাভাবিক। কেউ যদি সমাজের নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপবাদ, কলঙ্কিত করা বা উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়ান, তা সমাজের শান্তি ও ঐক্যের জন্য হুমকির সংবাদ। কিন্তু সেই ঝড়ের মধ্যে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে, সেগুলো নৈতিক ও কৌশলগতভাবে ঠিকভাবেই নেয়া দরকার — নাহলে উদ্দেশ্য বিপরীত প্রভাব ফেলে বসবে।
প্রথমত, বাড়ি ঘেরাও করা আইন নিজের হাতে নেওয়ার অসার প্রতিফলন। কোনও ব্যক্তির বাড়ি ঘেরাও করা মানে সরাসরি স্থানীয় শৃঙ্খলা ব্যাহত করা, তীব্র জনরোষ তৈরি করা এবং সহিংসতার সুযোগ তৈরি করা। এমন ধরনের কর্মসূচি কখনোই প্রতিবাদের সর্বোত্তম বা নিরাপদ উপায় হতে পারে না। বাড়ি ঘেরাও কিংবা জনরোষ থেকে যদি কোনো অঘটন ঘটে — তা মানুষহানিই হোক বা সম্পত্তি ক্ষতি — তার দায়ভার নিতে কে প্রস্তুত থাকবে? অনভিপ্রেত ফল কখনোই আমাদের আকাঙ্খিত লক্ষ্য হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, কৌশলগত বিচারে বাড়ি ঘেরাও জাতীয় পদক্ষেপ ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহানুভূতি বাড়ানোর বিপরীত ফল দিতে পারে। সামাজিক মিডিয়া ও জনমত ম্যানিপুলেশনের যুগে প্রতিক্রিয়া-ভিত্তিক কর্মকাণ্ড মানুষকে ‘বন্দী-প্রেম’ বা ‘নির্যাতিত’ হিসেবে তুলে ধরতে আরও সুবিধা করে দেয়—ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তির টি.আর.পি বা প্রসার বাড়তে পারে। তাই আবেগে তাড়িত হয়ে এমন পদক্ষেপ নেয়াই আত্মঘাতী কৌশল হতে পারে।
তৃতীয়ত, ন্যায় ও আইনের পথই সবচেয়ে শক্ত। যদি কোনো সংবাদকারী বা ব্যক্তিগতভাবে কেউ ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন বলে ব্যাপক প্রমাণ থাকে, তাহলে উত্তম কর্মপন্থা হলো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া — যথাযথভাবে এফ.আই.আর. দায়ের করা, অভিযোগপত্র জমা দেওয়া, এবং প্রয়োজন হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। পুলিশ প্রশাসন যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থা না নেয়, জনগণকে তাৎক্ষণিক সহিংসতায় লিপ্ত না হয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে—শান্তিপূর্ণ ধরনা, থানায় মাননীয় স্মারকলিপি প্রদান, আইনি সহায়তার জন্য মানবাধিকার সংগঠন বা পেশাদার আইনজীবীর সহযোগিতা গ্রহণ—এইসব ব্যবস্থায় যেতে হবে। শান্তিপূর্ণ জনগণপ্রতিনিধিত্ব ও আইনি লড়াইই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অধিক ফলপ্রসূ হয়।
চতুর্থত, বিচারের মানদণ্ডে সাম্য বজায় রাখা জরুরি। কেউ যদি মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য দায়ী হন, তাহলে একইভাবে অন্য যে কোনো ব্যক্তি—ধর্ম, মত, বা রাজনৈতিক চিহ্ন যাই হোক না কেন—তাঁর বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় ন্যায়ের পরিভাষা নরম হয়ে যায় এবং দ্বৈত মানদণ্ড সমাজে ফাটল সৃষ্টি করে। তাই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া উচিত: মুসলিম বিদ্বেষের অভিযোগে যদি কোনো বাড়ি ঘেরাও করা যায়, তাহলে একই মাপকাঠিতে অন্যদেরকেও কেন বিবেচনা করা হবে না? এই প্রশ্নের সঙ্গতিপূর্ণ আইনি ও নৈতিক উত্তরের প্রয়োজন রয়েছে।
শেষ কথা—রাস্তায় নেমে জনরোষের আড়ালে কেউ যদি “বড় বিজয়” ভাবেন, তাদের জানানো দরকার—এই ধরনের বিজয় স্বল্পস্থায়ী আর বিপজ্জনক। ইসলামের, সব ধর্মেরই মূল শিক্ষাই সহিষ্ণুতা, সংযম ও ন্যায়। আমরা যদি সত্যিকারের ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতি আগ্রহী থাকি, তাহলে প্রতিটি অভিযোগ আইনগত পথে পাঠানো, প্রমাণ সংগ্রহ করা, এবং সহিষ্ণু ও বিবেচনাপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, কৌশল্যের সঙ্গে কাজ করলে সমাজে অযথা কলহ কমবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর হবে।
সুতরাং, “নাগরিক সচেতন সমাজ”সহ সকল সংগঠন ও প্রত্যেকে সতর্ক থাকুন—ভাবিয়া করিও কাজ; করিয়া ভাবিও না। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়; তলোয়ার নয়, আইন—এটাই সমাজকে সুস্থ এবং স্থায়ীভাবে রক্ষা করবে।