সম্পাদকীয়: কওমি /খারেজী মাদ্রাসার শিক্ষার সংকট—বিশ্ব স্বীকৃতির পথে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
কাতারসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাকরি বা উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে গেলে হাইস্কুল, ব্যাচেলর বা আলিয়া পর্যায়ের সার্টিফিকেট চাওয়া—এ এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, ১৫ বছর মেহনত করে হেফজ, দাওরা কিংবা ইফতার মতো উচ্চতর কওমি অথবা খারেজী মাদ্রাসার ডিগ্রি অর্জন করেও অনেকের সামনে সেই দরজাই খুলছে না, কারণ বিশ্ব সেই ডিগ্রিগুলোকে চিনে না, স্বীকৃতি দেয় না। “মেশকাত”, “দাওরা”, “হাইয়াতুল উলইয়া”—এসব নাম তাদের কাছে অপরিচিত এবং তাই অবহেলার কারণ। একটি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এর চেয়ে বড় হতাশা আর কী হতে পারে?
এই বাস্তব সংকটটা কোনো ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়—এটা একটি গোটা ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা। বহু ছাত্র দশকের পর দশক ধরে যেসব বই পড়ে, যেসব পরীক্ষায় অংশ নেয়, যেসব দক্ষতা অর্জন করে, তা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সমন্বিত নয়—এটাই মূল কারণ। অথচ আমাদের মুরুব্বিরা—যারা পরিবর্তনের সবচেয়ে যোগ্য অবস্থানে আছেন—তারা বিষয়টিকে প্রায়ই অবহেলা করেন বা পরিবর্তনের উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখেন। যে মাদরাসা কওমি পড়ুয়ার জন্য আলিয়া বা জাতীয় বোর্ডের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ তৈরি করে, তাকেই অনেকে বাংলাদেশে ‘গোমরাহ’ বলে দাগিয়ে দেয়—এ যেন অগ্রগতির বিরুদ্ধে এক অঘোষিত আন্দোলন।
প্রশ্ন হলো—তারা আসলে কী চান? কওমি অথবা খারেজী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কি শুধু মসজিদ–মাদরাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? একজন আলেম যদি পিএইচডি করতে চান, গবেষণা করতে চান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের জ্ঞান, চিন্তা, দাওয়াত পৌঁছে দিতে চান—তাতে ক্ষতির কী? বরং দুনিয়াজুড়ে ইসলামের একাডেমিক উপস্থিতি বাড়বে, মুসলিম তরুণদের সামনে নতুন দিগন্ত খুলবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কওমি কারিকুলামে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মতো জরুরি বিষয়ের দিকে খুব কম নজরই দেয়া হয়েছে।
বিশ্ব আজ দক্ষতা, প্রমাণপত্র, এবং স্ট্যান্ডার্ডাইজড শিক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে। আলিয়া বা স্কুল-কলেজের সার্টিফিকেটকে তারা চেনে কারণ তা একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কওমি শিক্ষা— যদিও জ্ঞানের দিক থেকে গভীর—কাগজপত্রের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে একজন যোগ্য কওমি অথবা খারেজী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পারে না, চাকরির জন্য যোগ্যতা দেখাতে পারে না, তার ১৫ বছরের শ্রম কেবল অদৃশ্য হয়ে যায়। এতে তার আস্থা ভেঙে যায়, নিজের অস্তিত্বকেও ছোট মনে হয়—এটা কোনো ছাত্রের প্রাপ্য নয়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—এই হতাশা মুরুব্বিদের হৃদয় স্পর্শ করে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। যদি সত্যিই করত, তাহলে কওমি অথবা খারেজী মাদ্রাসার আন্তর্জাতিক মানোন্নয়নে, সমমান সার্টিফিকেট প্রাপ্তিতে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা তৈরিতে, কিংবা হাইব্রিড সিস্টেম গড়ে তুলতে বড় পরিসরে উদ্যোগ নিতেন। কিন্তু সংস্কারের বদলে অনেকেই পিছিয়ে যাওয়াকে নিরাপদ মনে করেন—এটাই আমাদের বড় দুর্বলতা।
এই পরিস্থিতি থেকে একটাই ভুল সিদ্ধান্ত কখনোই নেয়া উচিত নয়—দাওরার পর সব স্বপ্ন গুটিয়ে ফেলে শুধু মসজিদ-মাদরাসায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকা। জ্ঞান কখনোই সংকীর্ণতার মধ্যে বন্দি থাকলে বেড়ে উঠতে পারে না। বরং আমাদের প্রয়োজন—
সংস্কার, স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, এবং প্রগতিশীল মানসিকতা।
আজ কওমি অথবা খারেজী মাদ্রাসার শিক্ষার গুণগত মান আছে—তবে তার কাগজপত্রের মূল্য, আন্তর্জাতিক পরিচয় এবং দক্ষতার স্বীকৃতি তৈরি করতে হবে। এই দায়িত্ব ছাত্রদের নয়, মাদরাসা ব্যবস্থার। আর এই পরিবর্তন রুখে দাঁড়িয়ে কেউই ইসলামের সেবা করছে না—বরং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে।
সময় এসেছে সত্যিটা স্বীকার করার:
শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলানো ছাড়া কওমি অথবা খারেজী মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য বিশ্ব দরজা খুলবে না।
এখন প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব, বাস্তবমুখী কাঠামো, এবং ছাত্রদের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।
অন্যথায় প্রতিটি প্রতিভাবান কওমি তরুণের মুখেই সেই একই বেদনার কথা উচ্চারিত হবে—
“আমার যোগ্যতা আছে, কিন্তু আমার সার্টিফিকেটের কোনো মূল্য নেই।”