Tranding

সম্পাদকীয়:রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার পতন ও গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ার সতর্ক ঘণ্টা

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এক কঠিন সত্য সামনে এনেছে—রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা আজ আর অবক্ষয়ের সতর্ক সংকেত নয়, বরং প্রকট বাস্তব। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের পর সংসদ ভবনের শপথ অনুষ্ঠানে ধর্মীয় স্লোগান তোলা সেই বাস্তবতার প্রথম বড় প্রকাশ। সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনার এই প্রবণতা সংসদের চরিত্রকে কলুষিত করেছে এবং স্পষ্ট করেছে যে ক্ষমতার কেন্দ্রে ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্য আজ গভীর সংকটে।

এর প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছে সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ—যারা দেশের সম্পূর্ণ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক নির্মাণের সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাদের নিরাপত্তা ও সমানাধিকার নিশ্চিত করার কথা, সেই ব্যবস্থাই যেন ধীরে ধীরে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জায়গা হারাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা আরেকটি উদ্বেগজনক মাত্রা যোগ করেছে। সরকারি তহবিল থেকে ধর্মীয় স্থাপনার অর্থব্যয়ের তথ্য জানতে আরটিআই দাখিল করা হলেও গঙ্গাসাগর ছাড়া কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হয়নি। স্বচ্ছতার নামে যে প্রশাসন নির্বাচনে প্রচার চালায়, তারাই যখন আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায়, তখন তা শুধু সন্দেহ নয়—দায়িত্বহীনতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বচ্ছতা যদি নির্বাচনী স্লোগান হয়ে থাকে, তবে বাস্তবে তা যেন ইচ্ছামত প্রয়োগের হাতিয়ার।

সংখ্যালঘু সমাজের দাবি—স্টাফ সেনসাস, জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব, ওবিসি সুবিধার ন্যায্য বণ্টন এবং ওয়াকফ সম্পত্তির সুরক্ষা—এগুলি কোনো “বিশেষ সুবিধা” নয়; এগুলি সংবিধানসম্মত অধিকার। অথচ বারবার এই চার ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক জড়তা, রাজনৈতিক অনীহা এবং সাংগঠনিক পক্ষপাত দেখিয়ে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যে রাষ্ট্র সংবিধান রক্ষার শপথ নেয়, সেই রাষ্ট্রই যখন ওই সংবিধানের সমতা নীতিকেই উপেক্ষা করে, তখন তা কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়—গভীর সাংবিধানিক সংকট।

হুমায়ুন কবিরের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে যত বিতর্কই তৈরি হোক না কেন, মূল প্রশ্নটি অস্বীকার করা অসম্ভব—বঞ্চিত মানুষ প্রতিবাদ করবেই। সরকারি নিয়োগ ও ভর্তি ব্যবস্থায় নাম নয়, রোল নম্বরভিত্তিক মূল্যায়নের প্রস্তাব তাই শুধু জরুরি নয়—স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার জন্য অপরিহার্য। যেকোনো স্বচ্ছ প্রশাসন এই ব্যবস্থা স্বাগত জানাবে; যে প্রশাসন তা এড়িয়ে যায়, তাদের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।

ইতিহাস বলে—জনগণের ন্যায্য দাবি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে রাষ্ট্র টলে যায়। প্রতিবেশী দেশের কোটা আন্দোলন সেই পাঠই দিয়েছে। গণতন্ত্রের শক্তি সরকারের হাতে নয়—জনগণের সচেতন প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতায়। সরকার যদি সেই বাস্তবতা ভুলে যায়, তবে আস্থা হারানোর ফলাফল যে কত বিস্ফোরক হতে পারে, তা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।

আজ তাই প্রশ্নটি শুধু সংখ্যালঘুর নয়, ভারতের গণতন্ত্রের অস্তিত্বের। রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক অধিকার সংরক্ষণ—এই তিনটি স্তম্ভ ভেঙে পড়লে গণতন্ত্র টিকে থাকে না। আর যখন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানগুলো পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তখন নাগরিকেরা শুধু বঞ্চিত হন না—ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

গণতন্ত্রের শক্তি রাষ্ট্রের ক্ষমতায় নয়; তার নাগরিকদের সমান মর্যাদায়। সেই মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই আজ জরুরি, অনিবার্য, এবং বিলম্ব সহ্য করে না।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.