Tranding

সম্পাদকীয়: নাম পরিবর্তনের রাজনীতি—পরিচয় মুছে ফেলার এক কৌশল

ইসরাইলি রাজনীতিবিদদের নাম পরিবর্তনের ইতিহাস নিছক কাকতালীয় নয়; এটি এক গভীর রাষ্ট্রীয় ও আদর্শিক পরিকল্পনার অংশ। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে ডেভিড বেন গুরিয়ন, গোলদা মাইর কিংবা এহুদ বারাক—প্রায় প্রত্যেক শীর্ষ নেতার নামের পেছনে আছে এক নতুন জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের ন্যারেটিভ। তাদের পারিবারিক ইউরোপীয় বা স্লাভিক নাম পরিত্যাগ করে হিব্রু নাম গ্রহণ আসলে ছিল একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঘোষণা—একটি ভিন্ন ভূখণ্ডে “আদিকালীন” উপস্থিতির দাবি প্রতিষ্ঠা করা।

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই যে নীতি কার্যকর হয়—সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পর্যন্ত হিব্রু নাম গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা—তা ছিল একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা। লক্ষ্য ছিল হিব্রু ভাষাকে কেবল কথ্য ভাষা হিসেবে নয়, বরং জাতিগত ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করা। আধুনিক হিব্রু ভাষার পুনর্জাগরণ এবং নাম পরিবর্তনের এই ঢেউ একই স্রোতে প্রবাহিত হয়েছে—ধর্মীয় ইহুদি পরিচয়কে একটি সেক্যুলার জাতীয় পরিচয়ে রূপান্তর করা।

তবে এই নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভৌগোলিক স্থানের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। ফিলিস্তিনের শত শত গ্রাম, নদী, উপত্যকা, পাহাড় এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের নাম হিব্রু ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে—একটি ভাষার আবরণে ইতিহাসের পুনর্লিখন। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব, তাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্মৃতি। বুদ্ধিজীবীরা একে যথার্থই বলেছেন ‘স্মৃতিহত্যা’—অর্থাৎ ইতিহাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা।

নাম, ভাষা ও পরিচয়—এই তিনটি উপাদানই একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তাই নাম পরিবর্তনের এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কেবল ভাষাগত নয়, বরং রাজনৈতিক অস্ত্র। যখন একটি শক্তি নিজের ভূখণ্ড দাবি করতে চায়, তখন সে শুধু জমি দখল করে না; সে নামও দখল করে, ইতিহাসও পুনর্লিখন করে। ইসরাইলের নাম পরিবর্তনের ইতিহাস ঠিক সেই প্রক্রিয়ারই অংশ, যেখানে নাম একধরনের মানচিত্রে রূপ নেয়—একটি এমন মানচিত্র যা ইতিহাসের ওপর নতুন গল্প চাপিয়ে দেয়।

আজকের বিশ্বে যখন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন নাম ও ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না, কিন্তু বিকৃত করা যায়—এটাই এই নাম পরিবর্তনের নীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য।

একটি রাষ্ট্র যদি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্য জাতির স্মৃতি মুছে ফেলতে বাধ্য হয়, তবে সেটি শক্তি নয়, বরং দুর্বলতারই চিহ্ন।

ইসরাইলের হিব্রু নামকরণ আন্দোলন তাই কেবল ভাষার পুনর্জাগরণ নয়; এটি এক জাতির স্মৃতি ও সংস্কৃতির উপর আরেক জাতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রকল্প। এবং ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে—যে জাতি অন্য জাতির নাম মুছে ফেলে, শেষ পর্যন্ত তার নিজের পরিচয়ও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.