Tranding

সম্পাদকীয় : মুসলিম বিদ্বেষ যখন বিনোদন 

আজকের ভারতবর্ষে মুসলিম বিদ্বেষ আর নিছক রাজনৈতিক অবস্থান নয়—এটি ক্রমে এক সামাজিক বিনোদন সংস্কৃতিতে রূপ নিচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু উদ্বেগজনক নয়, এটি গোটা সমাজের বিবেক, সংবেদনশীলতা এবং নৈতিকতার ওপর আঘাত হানছে।

সকালে টেলিভিশনের পর্দায় যখন ‘নতুন ভারত’ গঠনের নামে গর্বিত হিন্দুত্বের মহিমা প্রচারিত হয়, তখন সেই একই দিনে বাস্তবের রাস্তায় মুসলিম শিশু নিহত হয়, মুসলিম ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হয়, কিংবা কোনো এক মুসলিম যুবক 'লাভ জিহাদ'-এর তকমা গায়ে নিয়ে রাস্তায় গণপিটুনির শিকার হয়। একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রচারে ‘গর্বের ভারত’, অন্যদিকে নির্যাতিত এক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী—এই বৈপরীত্যই আমাদের সমাজের সবচেয়ে গভীর সংকট।

এই সংকট কেবল রাষ্ট্রের বা রাজনীতির সৃষ্টি নয়, বরং এক বৃহৎ সামাজিক সম্মতির ফল। যখন শিশু হত্যা, দোকান ভাঙচুর, কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রাইমটাইম টেলিভিশনে জায়গা পায় না, কিন্তু ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’ বা ‘মসজিদে মাইক’ নিয়ে তীব্র উসকানি ছড়ানো হয়, তখন প্রশ্ন উঠে—এই নীরবতা কাদের পক্ষে কাজ করছে?

কানপুরে ‘আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ানো মুসলিমদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, আর ইন্দোরে মুসলিম ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের ঘটনা ‘আইনশৃঙ্খলার ব্যত্যয়’ হিসেবে সংবাদে আসে। এটি শুধু এক ধরনের বৈষম্য নয়; এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানবিক অবজ্ঞার নমুনা।

স্ট্যানলি কোহেন ‘স্টেটস অব ডিনায়াল’ বলতে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন—নৃশংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া—তা আজকের আমাদের বাস্তবতায় নির্মমভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। গণমাধ্যম, রাষ্ট্র, এমনকি সমাজ—সবাই যেন সহিংসতাকে একধরনের নাটক বা বিনোদনের উপাদান হিসেবে দেখতে শিখেছে।

এই বাস্তবতাকে বুঝতে গেলে মাহমুদ মামদানির ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’ তত্ত্বটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—রাষ্ট্র কিভাবে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বি-মাত্রিক বিভাজন তৈরি করে। ‘নীরব ও অনুগত’ মুসলিমরা হয়তো সাময়িক স্বস্তিতে থাকে, কিন্তু যারা নিজেদের পরিচয় উচ্চারণ করে, যারা সমান অধিকারের প্রশ্ন তোলে, তাদের ‘অপরাধী’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এটিই ক্ষমতার বাস্তব চেহারা।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে প্রশ্ন ওঠে: তারা কি এমন এক সমাজে বাস করতে চায়, যেখানে নীরবতা হলো অপরাধের প্রতি সম্মতি, আর নিষ্ঠুরতা হলো প্রাত্যহিক বিনোদন?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ ঘৃণাকে বিনোদনে রূপ দেয়, সেই সমাজ বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। নাৎসি জার্মানির নীরব উদারপন্থিরা, আমেরিকার লিঞ্চিং-উদাসীন সাদা জনগোষ্ঠী কিংবা আজকের গাজায় ইসরায়েলি উল্লাস—সবই আমাদের স্মরণ করায়, যে ঘৃণার অনুকরণীয়তা শেষে নিজের ঘরেই আগুন ধরায়।

ভারত এক জটিল, বহুত্ববাদী রাষ্ট্র। তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন সংস্কৃতি। যদি এই ভিন্নতাকে আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হিসেবে দেখা হয়—তাহলে তা শুধু মুসলমানদের নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য আত্মহননের পথ হয়ে দাঁড়াবে।

আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে প্রশ্নটা আর কেবল মুসলিমদের নয়। এটি একান্তভাবে ভারতের আত্মার প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের চেতনায় ফিরতে চাই, নাকি ঘৃণাকে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ করে তুলতে চাই?

ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকেই এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.