সম্পাদকীয়:‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বলায় মামলা দেশের গণতন্ত্র কোথায় দাঁড়িয়ে?
দেশের সাম্প্রতিক ঘটনা—যেখানে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা পোস্টার, টি-শার্ট কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কারণে হাজারো মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে—তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির ওপর সরাসরি আঘাত।
'আই লাভ মুহাম্মদ’—এটি এক শান্তিপূর্ণ, ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ, যা ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(ক) ধারায় সুরক্ষিত মতপ্রকাশের অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। তাহলে এমন একটি বাক্য উচ্চারণ বা প্রদর্শনের কারণে কোনো নাগরিক কীভাবে গ্রেফতার হতে পারেন? কেন তাদের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বাস্তবতায় খুঁজলে স্পষ্ট হয় যে, এটি নিছক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়—এটি একটি সুপরিকল্পিত দমননীতি, যার লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে প্রান্তিক করে তোলা।
অন্যদিকে, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে হিন্দু দেবতার ছবি, অস্ত্রধারী মূর্তি কিংবা অন্যান্য প্রতীক সমানে ব্যবহার হলেও সেগুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না। তাহলে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ বাক্যটি এতটা সংবেদনশীল হয়ে উঠল কেন?
এটি দ্বৈত মানদণ্ডের একটি প্রকট উদাহরণ, যা ভারতের তরুণ মুসলিমদের মধ্যে হতাশা, বিচ্ছিন্নতা এবং অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে। এটি শুধু মুসলিম সমাজের ওপর নয়, গোটা ভারতীয় সমাজ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
আমরা মনে করি, এই দমননীতি বন্ধ হওয়া জরুরি। যে দেশে সংবিধান আছে, আইনের শাসন আছে, সেখানে ‘আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি’ বলার জন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া এক ধরণের রাজনৈতিক বর্বরতা।
ভারতের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের পদক্ষেপ জাতিগত বিভাজনকে তীব্র করে তোলে। এই বিভাজন শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি অশনি সংকেত।
আমরা ভারত সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই—এই অনাকাঙ্ক্ষিত গ্রেফতার ও মামলাগুলো অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। নাগরিকদের ধর্মীয় অনুভূতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো হোক। গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য প্রতিপালিত হোক—সংকীর্ণতা নয়, সহনশীলতার মাধ্যমে।