Tranding

আইন, যুক্তি ও মানবতার অবক্ষয়: বাংলাদেশ কোন পথে? — মোঃ আমিন আহাদুল্লাহ

বঙ্গদর্পণ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত একাধিক ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে—আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। উসমান হাদির মৃত্যু ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা, তার জেরে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো-এর কার্যালয়ে হামলা, এবং ধর্মীয় কুৎসার অজুহাতে কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই দীপুকে প্রকাশ্যে হত্যা—এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ।

উসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা শোকের সীমা ছাড়িয়ে প্রতিশোধপরায়ণতার রূপ নিয়েছে। কোনো মৃত্যুর ন্যায়বিচার দাবি করা নাগরিক অধিকার—কিন্তু সেই দাবি যদি যুক্তি ও আইনের সীমা অতিক্রম করে সহিংসতার ভাষায় প্রকাশ পায়, তবে তা ন্যায়বিচার নয়, বরং অরাজকতার জন্ম দেয়। এই অরাজকতার সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত দেখা গেছে প্রথম আলো কার্যালয়ে সংঘটিত হামলায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক স্তম্ভ। সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত মানে সেই স্তম্ভে কুঠারাঘাত—যার ফল ভোগ করে পুরো সমাজ।

আরও উদ্বেগজনক হলো ধর্মীয় অনুভূতির নামে দীপুর নির্মম হত্যাকাণ্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কুৎসা, যাচাইহীন অভিযোগ এবং উত্তেজিত জনতার হাতে একজন মানুষকে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা—এ দৃশ্য শুধু মধ্যযুগীয় বর্বরতার কথাই মনে করিয়ে দেয় না, বরং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থার প্রতিফলন ঘটায়। প্রশ্ন জাগে—আইন থাকলে জনতা কেন বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়? উত্তর একটাই: রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন জনতা শক্তিশালী হতে চায়।

ধর্ম এখানে ব্যবহৃত হয়েছে অস্ত্র হিসেবে—যেখানে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেওয়ার বদলে ধর্মকে পরিণত করা হয়েছে হিংসার বৈধতাদাতা শক্তিতে। এটি শুধু ধর্মের অপব্যবহার নয়, বরং ধর্মীয় সহাবস্থানের ওপর এক মারাত্মক আঘাত। কোনো ধর্মই বিচার ছাড়া হত্যাকে অনুমোদন দেয় না; তবু বাস্তবে আমরা তার উল্টো চিত্র দেখছি।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো অসম্ভব। দোষীদের রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে না পারলে রাষ্ট্র নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে—উসকানিমূলক বক্তব্য ও সহিংসতার রাজনীতি থেকে সরে এসে সংযম ও যুক্তির পথে ফেরার।

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সন্ধিক্ষণে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি আইন ও মানবতার পথেই এগোব, নাকি গুজব, প্রতিশোধ ও সহিংসতার অন্ধকারে হারিয়ে যাব? উসমান হাদি, দীপু কিংবা প্রথম আলোর ওপর হামলা—এই সব ঘটনার বিচার শুধু আদালতেই নয়, জাতির বিবেকেও হওয়া দরকার। নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.