গাজায় বিমান হামলা কমলেও ঠান্ডা ও ধ্বংসস্তূপে প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা
গাজায় সাম্প্রতিক সময়ে বিমান হামলার মাত্রা কমলেও ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু থামেনি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এখন শিশুরা বেশি মারা যাচ্ছে শীত, প্রবল বৃষ্টি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবন ধসে পড়ার কারণে। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অবরোধের ফলে গাজার অবকাঠামো ভেঙে পড়ায় এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক ঝড়ে গাজার বিভিন্ন তাঁবু শিবির ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র পানিতে তলিয়ে যায়। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ভেঙে পড়ে বহু পরিবার চাপা পড়েছে। এসব ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, এই প্রাণহানি ছিল প্রতিরোধযোগ্য। সংগঠনটির মতে, আবহাওয়া নয়, বরং জরুরি সহায়তা ও আশ্রয় সামগ্রী প্রবেশে বাধাই এই মৃত্যুর মূল কারণ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ত্রাণ, পানি, স্যানিটেশন এবং নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে কড়াকড়ি অব্যাহত রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রায় ১,৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন। পাশাপাশি পানির লাইন, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিদ্যুৎব্যবস্থা মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও গাজায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, তাদের কাছে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের জন্য আশ্রয় সামগ্রী প্রস্তুত রয়েছে, তবে সীমান্ত দিয়ে সেগুলো গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না। বর্তমানে গাজার প্রায় ৯২ শতাংশ স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত এবং উপকূলীয় এই ভূখণ্ডের বড় অংশ বাসিন্দাদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষিত।
এ কারণে অধিকাংশ ফিলিস্তিনি এখন জরাজীর্ণ তাঁবু বা ধসে পড়া কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবার ঝুঁকি নিয়েই ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে, কারণ সেখানে তাঁবুর তুলনায় কিছুটা নিরাপত্তা পাওয়া যাবে বলে তারা মনে করছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও জানিয়েছে, জাবালিয়া, আল-রিমাল, শেখ রাদওয়ান ও আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে একাধিক ভবন ধসে পড়ে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব ঘটনায় বহু শিশু ও নারী নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের অভিযানে ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ভাঙা, শরণার্থী শিবির উচ্ছেদ এবং জমি দখলের ঘটনা বাড়ছে। তুলকারেমের নূর শামস শিবিরে নতুন করে আরও বহু বাড়ি ভাঙার নির্দেশ জারি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ফিলিস্তিনি নেতারা ও জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, এসব পদক্ষেপের ফলে নতুন করে বড় আকারের বাস্তুচ্যুতি শুরু হতে পারে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, দখলদার শক্তির দায়িত্ব হলো খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাধ্যবাধকতা পালন হচ্ছে না বলে অভিযোগ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।
বিশ্লেষকদের মতে, বোমাবর্ষণ কিছুটা কমলেও অবরোধ ও সহায়তা সীমাবদ্ধ থাকায় গাজায় মানবিক বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা।