Tranding

প্রতিটি মসজিদ হতে পারে মানুষের কল্যাণের প্রাণকেন্দ্র : ডক্টর ফিরোজ উদ্দিন---

গ্রামের মসজিদ-কে কেন্দ্র করে মুসলিম সম্প্রদায় গড়ে তুলতে পারে একটা আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা। যে- সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে স্বজনপোষন ও জনন-জীবনে ক্ষতিকারক সবকিছু বন্ধ করা সম্ভব। আমার ব্যক্তিগত ও ক্ষুদ্র ভাবনা থেকে কিছু প্রস্তাব রাখলাম - শিশুদের জন্য প্রতি মসজিদে ইমাম সাহেবদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে "শিশু-মজলিস" গঠন করে শিশুদের মধ্যে " প্রাথমিক মানবিক মূল্যবোধ"-এর শিক্ষা প্রদান করা দরকার প্রত্যেক সপ্তাহ নির্দিষ্ট একটি দিনে ও সময়ে । শিশুদের উপযোগী ভাষায় তাদের সামনে নবী মুহাম্মদ (স:) সহ মহা-মানবদের জীবন ও তাদের আদর্শের কথা শোনাতে হবে গল্পের মতো করে । শিশুদের শুধুমাত্র পাঠ্য-মূলক শিক্ষার বাইরে শোনাতে হবে নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা, সঠিক ও বেঠিক - সত্য ও মিথ্যার ধারণা। সঠিক ও সত্য পথের ভালো দিক এবং বেঠিক ও মিথ্যার খারাপ পরিণতির কথা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তারপর তাদের দূর্নীতির কারণে সমাজের কি-কি ক্ষতি হয় বা হতে পারে ! বোঝাতে হবে দূর্নীতি কি ? দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কতোটা প্রয়োজন এবং দূর্নীতিমুক্ত সমাজ কিভাবে গড়ে তোলা যাবে তার উদাহরণ সহ সরল ভাষায় বর্ণনা করতে হবে । শিশুরা শৈশব থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পন করে আদর্শ মানুষ হিসেবে কিভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং তার পরিবার এবং যে-সমাজে সেই শিশু বা তার পরিবার বাস করে, কিভাবে সেই সমাজ তার মাধ্যমে সুন্দর হতে পারে, সমাজের মানুষ ভালো থাকতে পারে তার বর্ননা করতে হবে ।

প্রতিটি গ্রামে মসজিদ কেন্দ্রিক বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার এবং ও পরিষেবা দেওয়ার জন্য ইমাম/মোয়াজ্জিন-দের রীতিমতো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দরকার। পাশাপাশি দূঃস্থ, অসহায় ও গরীব বিধবাদের প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের লক্ষ্যে 

মসজিদের মহাল্লার একজন চিকিৎসক-কে অনুপ্রাণিত করতে হবে। পাশাপাশি ইমাম সাহেবের তত্ত্বাবধানে আর্থিক সচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তায় মহল্লার গরিব বিধবা , দূঃস্থ , অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এই ধরনের জন-কল্যাণমুখী উদ্যোগ প্রতিটি মসজিদে গৃহীত হলে সমাজ লাভবান হবে এবং মসজিদের গুরুত্ব ও মর্যাদা নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং মসজিদের মহল্লায় ইমাম সাহেবের গুরুত্ব এবং মর্যাদা মজবুত হবে । সেইসাথে মসজিদের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হবে। তারফলে মসজিদে নামাজীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ও যারা নামায আদায় করে না তাদের মধ্যেও নামাজ এবং মসজিদের সম্পর্ক তৈরি হবে। সমাজে নামাজীদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং মসজিদ ভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে সর্বোপরি সমাজে শান্তির বাতাবরণ তৈরি হবে এবং সমাজ থেকে অপরাধ, দুর্নীতি,অন্যায় দূর হবে । ইসলাম সব ধর্মের-সব বর্ণের- সব শ্রেণীর জন্য শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছে এবং নিজের ধর্ম সঠিকভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আল্লাহ শুধুমাত্র মুসলিম-দের জন্য, নবী মুহাম্মাদ (স:) শুধু মুসলমানদের নবী, কোরআন শুধুমাত্র মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ এই ধরনা থেকে মুসলিম উম্মাহকে সরতে হবে এবং প্রতিবেশী অমুসলিম ভাই-বোনদের ইসলামের মহাত্ব, সৃজনশীল চিন্তাধারা থেকে নবী মুহাম্মদ (স:)- এর মতাদর্শ বোঝাতে হবে । এতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্ব দৃঢ় হবে এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারা বজায় থাকবে। 

মসজিদকেন্দ্রিক একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে - সেখানে শিশুদের জন্য যেমন একটি বিভাগ থাকবে, তেমনি যুবকদের জন্য থাকবে একটি বিভাগ । যুবক বিভাগের মাধ্যমে 

এলাকার যুব সমাজকে মসজিদকেন্দ্রিক ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে তাদের দ্বারা এলাকায় অনেক জনকল্যাণ মূলক কাজ সম্পাদন করা যাবে,মানবিক মূল্যবোধ উজ্জীবিত হবে এবং তারা কিভাবে কর্মমুখী জীবন গড়তে পারবে তার উপযুক্ত পরামর্শ প্রদান করতে পারবে। সেই পরামর্শ শিক্ষা, ব্যবসা ও চাষ যেকোনো বিষয়ে হতে পারে । সপ্তাহে একদিন নিদৃষ্ঠ সময়ে যুবকদের জন্য তালিমের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা নৈতিক,মানবিক, দায়িত্বশীল, চরিত্রবান এবং কঠোর পরিশ্রমী হতে পারে ।যুবকদের এইভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে মসজিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক মজবুত হবে এবং তারা আস্তে আস্তে নামাজী তৈরি হয়ে যাবে ।

কেউ কেউ হয়তো বলবেন মসজিদে বসে দুনিয়াবি কথা বলা যাবে না- তাদের কথা যথার্থ-কিন্তু,মানুষের কল্যাণের কথা বলা, অভাবীদের অভাব দূর করার কথা বলা, কর্মহীনদের কর্মসংস্থানের পরামর্শ দেওয়া, শিশু-যুবকদের নৈতিক ও মানবিক চরিত্র গঠনের পরামর্শ দেওয়া, সমাজের উন্নয়নের কথা বলা অবশ্যই দুনিয়াবি কথা নয় বরং সুনিশ্চিত করে এগুলো-ও গুরুত্বপূর্ণ একপ্রকার ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত । তবে অবশ্যই নামাজ- আজান চলাকালীন সময়ে বা নামাজরত ব্যক্তির অসুবিধা না হয় সেদিকেও মজবুতভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে । সমাজের কল্যাণকর্মে অগ্রগামী থাকতে উৎসাহিত করে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মসজিদে প্রতিমাসে মাষিক দ্বিনী আলোচনা সভা ( মজলিস)-এর ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে ইমাম সাহেবের তত্ত্বাবধানে বিষয়ভিত্তিক ধর্মীয় আলোচনা ও পারস্পরিক মতবিনিময় করার এবং জানা- বোঝার পরিবেশ তৈরী করতে হবে। এই মজলিসে যাতে সব বয়সের মানুষ উপস্থিত হয় তার জন্য আহ্বান করতে হবে, সেখানে হবে কোরআনের তরজমা, হাদিসের তফসির বাংলায় তরজমা করে উপস্থাপন করতে হবে। মসজিদের মহল্লায় বসবাস করছেন এমন মুসলিম ও অমুসলিম সব সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে কোরআন এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি ও আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিটি বাড়িতে বাংলা কোরআন প্রদানের করতে হবে। কারণ কোরআন এমন একটি জীবন্ত সংবিধান যেখানে জন্ম থেকে মৃত্যু, ব্যবসা, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, মানবতা, সাংসারিক জীবনবিধান, নৈতিক চরিত্র গঠন থেকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, অন্য-ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার নির্দেশ, অ-মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সৌভ্রাতৃত্বের কথা পরিস্কার ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মসজিদকেন্দ্রিক কোরানিয়া মাদ্রাসা (মক্তব) তৈরি করতে হবে সহীহভাবে কোরআনের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য। স্কুল শিক্ষার ব্যাঘাত না করে সপ্তাহে কমপক্ষে ৫-দিন বিকালে আছরের নামাযের পর ১-ঘন্টা করে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কোরআন প্রশিক্ষণ এবং যুবক ও বয়স্কদের জন্য সন্ধ্যায় মাগরিব নামাজের পর থেকে এশা নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে ১- ঘন্টা করে কোরআন প্রশিক্ষণ সহ ওজু- গোসল, পাক-নাপাক, হারাম- হালাল, জায়েজ- নাজায়েজ এর প্রশিক্ষণ দেওয়া বিশেষ দরকার । এছাড়া মসজিদের তত্ত্বাবধনে মহল্লায় বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের থেকে রমজান মাসে জাকাত,ফিতরা সংগ্রহ করে গ্রামের গরীব, দূঃস্থ, অসহায় বিধবা এবং যে-সমস্থ মাদ্রাসায় এতিম ছাত্র আবাসিকভাবে পড়াশোনা করছে সংখানুপাতে নিদৃষ্ঠ একটি অংশ সেখানে বন্টন করার ব্যবস্থা নেওয়া বিশেষ দরকার।

প্রতিটি মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ প্রতিবছর যাকাত আদায় করে থাকেন । কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যথাযথ হিসাব ছাড়াও অনেক জাকাত প্রদান করেন। হিসাব ছাড়া জাকাত কোনোভাবেই আদায় হবে না। তাই প্রয়োজনে ইমাম সাহেবের সহযোগিতা নিয়ে জাকাতের হিসাব করা যেতে পারে। এইভাবে মসজিদকেন্দ্রিক ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও ছাত্রসংখ্যা অনুপাতে মাদ্রাসার মধ্যে বন্টন করে একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করে তাহলে সকলেই অবগত হয়ে সন্তূষ্ঠ হবে । পাশাপাশি সংগ্রহীত অর্থ থেকে প্রতিবছর ২/৪ জন কর্মহীন দরিদ্র পরিবারকে ছোটো ব্যবসার জন্য প্রয়োজন মতো এককালীন পুঁজি দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে প্রতিবছর কিছু দরিদ্র কমবেই ইনশাআল্লাহ । তাছাড়া মসজিদ আল্লাহর ঘর, তাই নিজেদের ঘরের থেকে মসজিদ সুন্দর করা দরকার এবং পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন, জান্নাতী পরিবেশ তৈরি করার দিকে মসজিদ পরিচালন সমিতির বা মসজিদের ট্রাস্টবোর্ড-কে নজর রাখতে হবে । প্রতি বছর রমজান মাসে তারাবীহ সহ ইফতার ও গ্রামবাসীদের সকলের তরফ থেকে কমপক্ষে একজন মুসুল্লি-কে একমাসের জন্য "এতেকাফের" ব্যবস্থা করাতে হবে । বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সবকিছুতেই রাজনীতি চলে আসে, তাই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে- যাতে মসজিদে বা মাদ্রাসায় কোনো রাজনীতি না ঘেঁষতে পারে। গ্রামের সমস্যা, পারিবারিক সমস্যার সমাধানে মসজিদ কতৃপক্ষ ও ইমাম সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে । সেক্ষেত্রে ইমাম সহ মসজিদ কমিটি বা মসজিদের ট্রাস্টবোর্ড বা পরিচালনা কমিটি- গ্রামের সাধারণ সমস্যা বা পারিবারিক সমস্যা সমাধানে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে পারে । ইমাম সাহেবের কাছে থাকতে হবে গ্রামের ভোটার লিস্ট সহ গ্রামের প্রতিটি পরিবারের সম্পূর্ণ তথ্য যুক্ত রেজিস্টার, সেখানে প্রতিটি পরিবারে হেড-সহ মহিলা, পুরুষ, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের নাম, জন্মতারিখ,কোন ক্লাসে পড়ছে তার সম্পূর্ণ তথ্য, পাড়াশুনা করছে তার তথ্য সহ বিয়ের রেজিস্টার এবং ডেথ (মৃত্যু) রেজিস্টার এবং ইমামের প্যাড ও সীল । বিভিন্ন সময়ে এগুলি প্রয়োজন হয়ে থাকে আমাদের । সর্বপরি ইমাম ও মোয়াজ্জিন-দের বর্তমান বাজার বরাবর সাম্মানিক দেওয়া দরকার । যাতে শরীয়তের বিরোধী কোনো পথ অবলম্বন করে কোরআন-হাদিসের বিনিময়ে তাদের অর্থ উপার্জন করতে না হয় সংসারিক প্রয়োজন মেটাতে । এর জন্য মুসলিম সম্প্রদায়কে সচেতন হতে হবে এবং নৈতিক দায়িত্ব ও ধর্মীয় কর্তব্য পালনে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে একটা আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সহজেই গঠন করা সম্ভব হতে পারে।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.