"PM-15" কর্মসূচির বাস্তবায়নে গলদ - সংখ্যালঘু উন্নয়ন থেমে যাচ্ছে অর্ধেক পথে : আলহাজ্ব ড. ফিরোজ উদ্দিন মোহাম্মাদ শফী ---
** PM-15 কর্মসূচির বাস্তবায়নে গলদ: সংখ্যালঘু উন্নয়ন থেমে যাচ্ছে অর্ধেক পথে, ভারতের সংবিধানে সমতার অধিকার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও, কেন্দ্রীয় সরকারের “প্রধানমন্ত্রী জনকল্যাণমূলক ১৫ দফা কর্মসূচি” (PM’s New 15 Point Programme for the Welfare of Minorities) বাস্তবায়ন আজ প্রশ্নের মুখে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে ঘোষিত এই কর্মসূচি ২০০৬ সাল থেকে কার্যকর হলেও, বাস্তব ক্ষেত্রে এর অগ্রগতি খুবই সীমিত — এমনটাই উঠে এসেছে সরকারি ও বেসরকারি মূল্যায়নে।
** কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য :
PM-15 কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
মোট ১৫টি দফার মাধ্যমে এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল—
* শিক্ষা ও বৃত্তির প্রসার,
* মাদ্রাসা আধুনিকীকরণ
* দক্ষতা উন্নয়ন ও স্ব-রোজগার,
* আবাসন ও স্বাস্থ্যসুবিধা,
* সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।
* প্রতিটি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি প্রকল্পে সংখ্যালঘু ঘন-বসতি অঞ্চলগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশও ছিল।
** বাস্তবায়নের ঘাটতি:
কাগজে-কলমে কর্মসূচি যতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বাস্তবে তার ফল ততটাই সীমিত। নিচে প্রধান কয়েকটি ঘাটতি উল্লেখ করা হলো—
* বাজেটের স্বচ্ছতা ও পৃথক বরাদ্দের অভাব : একটি তথ্য অধিকার আইনে (RTI) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, PM-15 কর্মসূচির জন্য কোনো স্বতন্ত্র বাজেট বরাদ্দ নেই। বরং বিভিন্ন মন্ত্রকের বিদ্যমান প্রকল্পের মধ্যেই সংখ্যালঘু কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে কার্যকর অর্থব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং-এর স্বচ্ছতা নষ্ট হচ্ছে। (সূত্র: NDTV Report, 2019)
* রাজ্যভেদে বাস্তবায়নের বৈষম্য : পশ্চিমবঙ্গ, কেরল বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে প্রকল্পগুলির অগ্রগতি কিছুটা দৃশ্যমান হলেও, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের সংখ্যালঘু ঘন এলাকায় বাস্তবায়ন কার্যত স্থবির। অনেক জেলায় “উপগ্রাহ্য সংখ্যালঘু ঘনত্বযুক্ত এলাকা” চিহ্নিতই করা হয়নি।
* শিক্ষাক্ষেত্রে সীমিত সাফল্য :প্রাক-ম্যাট্রিক ও পোস্ট-ম্যাট্রিক বৃত্তির সুবিধা পাওয়ার জন্য অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া থাকলেও, অনেক সংখ্যালঘু অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ ও নথি-নির্ভর জটিলতায় শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে।মাদ্রাসা আধুনিকীকরণ প্রকল্পও বহু রাজ্যে স্থগিত বা অসম্পূর্ণ।
* দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে গলদ : NMDFC (National Minorities Development and Finance Corporation)-এর মাধ্যমে ঋণ ও প্রশিক্ষণ প্রদানের পরিকল্পনা থাকলেও, ২০২4-২৫ অর্থবছরে টার্গেটের মাত্র ৪০-৪৫ % পূরণ হয়েছে।ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রকল্পে সংখ্যালঘু অংশগ্রহণ নেমেছে ১২ %-এর নিচে।
* আবাসন ও নগর উন্নয়ন কর্মসূচিতে অসম বণ্টন : PMAY-Urban প্রকল্পে কেন্দ্রের স্বীকৃত রিপোর্ট অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশ মাত্র ১৫ %। কিন্তু বাস্তবে অনেক সংখ্যালঘু পরিবারের নাম তালিকায় নেই বা স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। (সূত্র: Rajya Sabha Reply, 2024)
* মনিটরিং-এর দুর্বলতা : কেন্দ্রীয় পর্যায়ের মনিটরিং কমিটি থাকলেও, জেলা ও রাজ্য পর্যায়ে নিয়মিত মূল্যায়ন সভা হয় না। ফলে প্রকল্পের গন্তব্য-নির্দিষ্ট অগ্রগতি অজানা থেকে যাচ্ছে।
** বিশেষজ্ঞদের মত :
* নীতিনির্ধারক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, PM-15 কর্মসূচির মূল ব্যর্থতা হলো “নির্দেশ আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই”।যতদিন না প্রকল্পগুলির জন্য আলাদা বাজেট ও বাধ্যতামূলক টার্গেট নির্ধারণ করা হয়, ততদিন সংখ্যালঘু উন্নয়ন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে।
** জনগণের অভিজ্ঞতা :
* বহু সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামীণ এলাকায় এখনও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে।
* স্কুল/ মাদ্রাসায় পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই,
* স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত ডাক্তারের অনুপস্থিতি
* স্ব-রোজগার ঋণ প্রকল্পে আবেদন করেও টাকা মেলেনি — এমন অভিযোগ প্রায় সর্বত্রই শোনা যায়।
এছাড়া প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য ও সচেতনতার অভাবে অনেকেই জানেন না যে এই সুবিধাগুলি তাঁদের জন্য প্রযোজ্য।
** কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান :
কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দাবি, PM-15 কর্মসূচি “নিয়মিত চলছে” এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। তবে, বাস্তবে পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে—
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫০ %-এরও কম পূরণ হয়েছে।
** বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ জরুরি :
1. পৃথক বাজেট বরাদ্দ ও দায়বদ্ধ ব্যয়-পর্যবেক্ষণ।
2. জেলা-স্তরে স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন।
3. প্রকল্প-সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় ভাষায় প্রচার-অভিযান।
4. শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়েদের বিশেষ অগ্রাধিকার।
5. প্রতিটি রাজ্যে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্দিষ্ট “PM-15 সেল” গঠন।
** সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নয়ন যেভাবে কল্পনা করা হয়েছিল, PM-15 কর্মসূচির দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না। সংবিধান ও সরকারের নীতিগত প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নথি থেকে বেরিয়ে মানুষের জীবনে পৌঁছাবে।
ভারতের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব কেবল তখনই, যখন প্রতিটি ধর্ম, ভাষা ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান সুযোগ ও মর্যাদা পাবে — সেটিই সংবিধানের প্রকৃত আত্মা এবং PM-15 কর্মসূচির মূখ্য উদ্দেশ্য।