ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে হযরত মাওলানা হুসাইন আহমেদ মাদানী ( রহ:)-এর অবদান
ফিরোজ উদ্দিন মোঃ শফি:
হযরত মাওলানা হুসাইন আহমেদ মাদানী রহ.ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম, চিন্তাবিদ, রাজনৈতিক নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বই নন, বরং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর ও কর্মী ছিলেন। তাঁর অবদান ও আত্মবলিদানকে কয়েকটি দিক থেকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা যায়।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা : ৬ অক্টোবর ১৮৭৯, উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ অঞ্চলের কাছে টান্ডা গ্রামে। তিনি দারুল উলুম দিওবন্দ থেকে হাদীস, ফিকহ ও অন্যান্য ইসলামী শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন।
শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহ.-এর ঘনিষ্ঠ শিষ্য ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে রাজনৈতিক ও স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হন।
স্বাধীনতা আন্দোলনে সরাসরি ভূমিকা :
(ক) রেশমি রুমাল আন্দোলন (Silk Letter Movement)- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ বিরোধী গোপন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে “রেশমি রুমাল আন্দোলনে” সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ব্রিটিশরা এ পরিকল্পনা ফাঁস করে দিলে তিনি গ্রেফতার হন এবং মাল্টা দ্বীপে প্রায় ৩ বছর কারাবন্দী থাকেন (১৯১৭–১৯২০)।
(খ) জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ ১৯১৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী উলামাদের সংগঠন জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ-এ যোগ দেন এবং পরে সভাপতি হন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ভিত্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন।
(গ) অসহযোগ আন্দোলন ও সাইমন কমিশন বিরোধ মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২০–২২) মুসলিম সমাজকে যুক্ত করেন। সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলনসহ বিভিন্ন ব্রিটিশ বিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন : মাওলানা মাদানী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে হিন্দু-মুসলিম একত্রে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম করবে। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা করে বলেছিলেন-ধর্ম আলাদা হলেও জাতি বা রাষ্ট্রে বসবাসের ভিত্তি ভূখণ্ড হতে পারে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “নকশে-এ-হায়াত” ও “মুতাহিদা কওমিয়ত ও ইসলাম”-এ তিনি এই মতবাদ বিশদভাবে তুলে ধরেন।
কারাবাস ও আত্মত্যাগ : জীবনের প্রায় ১৪ বছরের বেশি সময় বিভিন্ন কারাগারে অতিবাহিত করেছেন। মাল্টা দ্বীপ, লাহোর, আগ্রা, দিল্লি ও অন্যান্য জেলখানায় শারীরিক কষ্ট, নির্যাতন এবং দীর্ঘকাল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতে হয়েছিলো । তিনি ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, খ্যাতি বা পদ-মর্যাদা ত্যাগ করে আজীবন নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে অবদান : দারুল উলুম দেওবন্দের মুহাদ্দিস ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে বহু প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন। ইসলামী ঐক্য, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায় ও উপনিবেশবিরোধী চেতনা জাগিয়ে তুলেছেন। স্বাধীনতার পর ভূমিকা: ১৯৪৭ সালের পরও তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন। দেশভাগের পর ভারতে থেকে গেছেন, মুসলমানদের মনোবল অটুট রাখতে কাজ করেছেন।
মৃত্যু : ৫ ডিসেম্বর ১৯৫৭ সালে ইন্তেকাল করেন এবং দারুল উলুম দেওবন্দের প্রাঙ্গণে সমাহিত হন। মাওলানা হুসাইন আহমেদ মাদানী রহ. শুধু একজন আলেম ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা এবং উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের সাহসী নেতা। তিনি নিজের জীবন, সময় ও স্বাধীনতা ত্যাগ করে জাতির জন্য কাজ করেছেন। তাঁর আত্মবলিদান ও রাজনৈতিক দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক আছে এবং আজীবন থাকবে নিশ্চিতভাবে, যতদিন শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এই পৃথিবীতে থাকবে ।
পরিবার ও বংশ পরিচয় : তাঁর পিতার নাম ছিল স্যাইয়েদ হাবীবুল্লাহ, যিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর বংশধর— হযরত হুসাইন (রা.) থেকে ৩৫ প্রজন্মের দূরবর্তী উত্তরসূরি । উত্তরপ্রদেশের উনাও জেলার বাঙ্গারমউ শহরে জন্মানোর পর তাদের পূর্বপুরুষরা ফৈজাবাদের টান্ডা অঞ্চলে বসতি গড়েন ।মাদানী পরিবার ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও শিক্ষামূলক নানা ক্ষেত্রে প্রভাবশালী: মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী নিজে ছিলেন প্রভাবশালী ইসলামিক ব্যক্তিত্ব তেমনি, তাঁর বড়োছেলে হযরত মাওলানা আসাদ মাদানী সাহেব (রহ:), যিনি বিপুল রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে পরিচিত; রাজ্যসভার সদস্যও ছিলেন । হযরত মাওলানা হুসাইন আহমেদ মাদানী (রহ)- এর দ্বিতীয় সন্তান হযরত আমিরুল হিন্দ হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী অবিভক্ত ভারতবর্ষের অন্যতম রাহাবার । মাদানী পরিবার ভারতবর্ষের সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য। অথচ, ভারতের বর্তমান শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পার্টির নেতা ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা মাদানী পরিবারের অন্যতম সদস্য ও হযরত মাওলানা আসাদ মাদানী সাহেব(রহ)-এর সাহেবজাদা ও জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের বর্তমান সর্বভারতীয় সভাপতি হযরত মাওলানা মাহমুদ মাদানী সাহেবকে ভারতবর্ষ থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশে পাঠানোর নিদান দিয়েছেন। মাওলানা মাহমুদ মাদানী সাহেব রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন । হাস্যকর বিষয় হল হেমন্ত বিশ্বশর্মার মতো অর্ধ-শিক্ষিত বিজেপি নেতাদের মন্তব্য। তারা জানে না ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পরিচিতি। কারণ তারা বা তাদের পূর্বসূরীরা ছিল ব্রিটিশদের দালাল এবং পদলহানকারী ও সাভারকার- নাথুরাম গডসের সুযোগ্য উত্তরসূরী ।