হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআর ঐতিহাসিক বৈঠক
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআর সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ করেছেন। এ বৈঠকটি সিরিয়ার জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি সিরিয়ার কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথম আনুষ্ঠানিক যুক্তরাষ্ট্র সফর।
বৈঠকে দুই নেতা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট শারআরের সঙ্গে “ভালো সম্পর্ক” গড়ে তুলেছেন এবং সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখছেন।
সিরিয়ার কূটনৈতিক প্রত্যাবর্তন
সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানায়, বৈঠকে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শিবানি ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় সিরিয়া–মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
বৈঠকের আগে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, এই সফরকে “সিরিয়ার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথে অগ্রগতি
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস আগামী ১৮০ দিনের জন্য ‘সিজার আইন’ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে কংগ্রেসে আইনটি বাতিলের প্রস্তাব তোলা হবে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সিরিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে, যা মার্কিন ও আঞ্চলিক কোম্পানিগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রেজারি, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র দপ্তর যৌথভাবে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবিধি সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে সিরিয়াকে আবারও ওয়াশিংটনে তাদের দূতাবাস খুলে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।
নিরাপত্তা চুক্তি ও আঞ্চলিক সমঝোতা
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সিরিয়া ‘আইএস’ বিরোধী আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। এই ঘোষণা বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর প্রকাশ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিরিয়ার নতুন অধ্যায়
আহমেদ আল-শারআর (৪২) ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘ ৫০ বছরের আসাদ পরিবারের শাসনের পতনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পূর্বে তিনি সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে এক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন, যারা অল্প সময়ের অভিযানে আসাদ সরকারকে উৎখাত করে।
নতুন সরকারের অধীনে সিরিয়া ধীরে ধীরে ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব থেকে দূরে সরে এসে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই নতুন সম্পর্ক সিরিয়ার পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জ
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে সিরিয়ার পুনর্গঠনে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তবে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিভাজন সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক বছরে সংঘাতে প্রায় ২,৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
এই সফরের মধ্য দিয়ে সিরিয়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের কূটনৈতিক অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে এক বড় পদক্ষেপ নিল — যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।