Tranding

আমরা কজন মনে রেখেছি যে আজ তাঁর জন্মদিন?

"অজ পাড়াগাঁ, কাঠ বাঙাল এবং নিচু জাত - এই ত্র্যহস্পর্শ মাথায় নিয়ে" ১৮৯৩ সালের ৬ই অক্টোবর জন্ম হয়েছিল মেঘনাদের। ঢাকা থেকে পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে শেওড়াতলি গ্রামে। বাবা জগন্নাথের মুদির দোকান, বাড়িতে পড়াশোনার বালাই নেই বললেই চলে। এহেন পরিস্থিতিতে মেঘনাদ যখন পড়াশোনার দিকে ঝুঁকলেন, বাবা বেঁকে বসলেন। তাঁর ইচ্ছে ছেলে দোকানে সাহায্য করুক। জোর করেই বাল্যকালে লেখাপড়াটা চালালেন তিনি। সম্বল স্রেফ অসাধারণ মেধা ও স্মরণশক্তি।

সবচেয়ে কাছাকাছি মিডল স্কুল দশ কিলোমিটার দূর। দাদা জয়নাথের সাহায্যে আশ্রয় মিলল স্থানীয় এক ডাক্তারের বাড়ি। কিআশ্রয়দাতার বাড়িতে ফাইফরমাস খেটে, তাদের গরুর পরিচর্যা করে, নিজের নিচু জাতের জন্য আলাদা থালাবাটিতে খেয়ে, সেই থালাবাটি নিজে মেজে, খালি পায়ে স্কুল এমনকি কলেজ গিয়ে মেঘনাদ দাঁতে দাঁত চেপে স্রেফ বিদ্যাচর্চা করে গেছেন। অপ্রত্যাশিতভাবে প্রেরণা ও উৎসাহ পেলেন অঙ্কের শিক্ষক প্রসন্নকুমার চক্রবর্তীর কাছে। 

এইসময়ের একটি ঘটনা বালক মেঘনাদের মনের উপর গভীর ছাপ ফেলল। "একবার সরস্বতী পূজোর সময়ে পুরোহিত তাঁকে অত্যন্ত রুক্ষভাবে পূজাবেদীর উপর থেকে নেমে যেতে বলেন, কারন তিনি উচ্চবর্ণের ছিলেন না। এই ঘটনা সেই বালকের মনে কিরকম প্রতিক্রিয়া জাগিয়েছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। তারপর থেকে মেঘনাদ পূজা-পার্বণের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছেদ করেন।" ভবিষ্যতজীবনে তিনি যে নাস্তিকতা ও যুক্তিবাদের প্রবক্তা হয়ে উঠবেন তাতে আর আশ্চর্য কি ! তবে নাস্তিক হলেও স্রেফ কৌতুহলজনিত কারনে সবরকম ধর্মগ্রন্থ তিনি খুঁটিয়ে পড়েছিলেন।

এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তিনি পূর্ববাংলার ছাত্রদের মধ্যে প্রথম হলেন। আর্টসও পড়তে পারতেন কারন ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর প্রথম স্থান ছিল। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বিজ্ঞান। হয়ত তরুন মেঘনাদের মনে হয়েছিল, "একমাত্র বিজ্ঞানের চর্চাই তাঁকে চারপাশের ঐ মূঢ়, বুদ্ধিবিমুখ, অত্যাচারী, হীন সনাতনপন্থার নাগপাশ কেটে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে।"

১৯১১ সালে মেঘনাদ প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন। বিএসসি এবং এমএসসি দুইক্ষেত্রেই ফার্স্টক্লাস সেকেন্ড হলেন মেঘনাদ সাহা। ফার্স্ট হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। 

কলেজে পড়াকালীন আবার জাতপাত বিদ্বেষের শিকার হলেন মেঘনাদ। ইডেন হিন্দু হোস্টেলে উচ্চবর্ণের ছাত্ররা তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করতে থাকে। এমনকি এক টেবিলে বসে খেতেও অস্বীকার করে তারা। অবশেষে যখন তাঁকে সরস্বতী পূজোয় অঞ্জলী দিতে বাধা দেওয়া তখন মেঘনাদের কয়েকজন সুহৃদ ও সহপাঠী হোস্টেল ত্যাগ করেন। এইসব ঘটনা মেঘনাদের হিন্দু গোঁড়ামী সম্পর্কে বিদ্বেষ আরও বাড়িয়ে তোলে।

এমএসসি পাশ করে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে লেকচারার হিসাবে যোগ দেন। ১৯১৭ সালে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হল ফিলজফিক্যাল ম্যাগাজিনে - বিষয় 'অন ম্যাক্সওয়েল স্ট্রেসেস'। ১৯১৯ সালে মেঘনাদ সতীর্থ সত্যেন্দ্রনাথের সাথে মিলে আইনস্টাইনের 'থিয়োরী অফ রিলেটিভিটি' পৃথিবীতে প্রথমবার জার্মান থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করলেন। এইসময় তাঁর একের পর এক গবেষনাপত্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সায়েন্স ম্যাগাজিনগুলোয় প্রকাশিত হতে লাগলো। ১৯১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেলেন ডক্টর অফ সায়েন্স ডিগ্রী। ১৯২০ সালে মেঘনাদের তাপ আয়োনন তত্ত্ব (আয়োনাইজেশন অফ দি সোলার ক্রোমস্ফিয়ার) তাঁকে বিজ্ঞানবিশ্বের স্বীকৃতি এনে দিল।

মেঘনাদ সাহার বিজ্ঞানজগতের কৃতিত্ব নিয়ে আলোচনায় ঢুকছি না বরং তাঁর জীবনদর্শন নিয়ে কয়েকটি কথা বলা যাক। তিনি জীবনের প্রতিটি স্তরে বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি প্রয়োগে বিশ্বাসী ছিলেন। জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই তিনি ভণ্ডামীকে প্রশ্রয় দেন নি। অপ্রাসঙ্গিক মনে করে পিতামাতার মৃত্যুর পর তিনি শ্রাদ্ধ করেন নি। চাইতেন সমাজের সব স্তরে যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসার হোক। গান্ধীজীর খাদি ও চরকা নীতির সম্পুর্ণ বিরোধী ছিলেন মেধনাদ। "তাঁর মতে এগুলি অচল, গ্রামে ফিরে যাওয়ার ডাক ভাবালুতা ছাড়া আর কিছু নয়।" মার্কসের সাম্য চিন্তা মেঘনাদ সাহাকে আলোড়িত করেছিল। সাহা গান্ধীর পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতা হিসাবে অনেক বেশি অনুরক্ত ছিলেন লেনিনের প্রতি। লেনিনের দর্শনকে তাঁর মনে হয়েছিল অনেক বেশি যুক্তিসিদ্ধ। 

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমার ব্যবহার সারা দুনিয়াকে চমকে দিল। দেখা গেল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ব্রিটেন, জার্মানি প্রভৃতি দেশও পরমাণু গবেষণায় এগিয়ে গেছে। সাহা বিষয়টি নিয়ে উঠেপড়ে লাগলেন। তিনি পরমাণুর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বোমা বানানোর পরিবর্তে জ্বালানি চাহিদা মেটানোর দিকে মনোযোগ দিলেন। অনেক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে তিনি একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুললেন ‘ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ যার বর্তমান নাম ‘সাহা ইনস্টিটিউশন অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’।

১৯৩৮ সালে মাসিক ভারতবর্ষ পত্রিকায় 'একটি নুতন জীবনদর্শন' শীর্ষক প্রবন্ধে অন্ধ ও গোঁড়া ধর্মাবলম্বীদের ব্যাঙ্গবাণে জর্জরিত করে তিনি লিখলেন - ‘সবই ব্যাদে আছে’। এ নিয়ে অনিলবরণ রায় নামে এক হিন্দুত্ববাদী নরকগুলজার শুরু করলে মেঘনাদ সাহা লিখলেন - “বিগত কুড়ি বৎসরে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ইত্যাদি সমস্ত হিন্দুশাস্ত্রগ্রন্থ এবং হিন্দু জ্যোতিষ ও অপরাপর বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় প্রাচীন গ্রন্থাদি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া আমি কোথাও আবিষ্কার করিতে সক্ষম হই নাই যে, এই সমস্ত প্রাচীন গ্রন্থে বর্তমান বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব নিহিত আছে। ........ এদেশে অনেকে মনে করেন, ভাস্করাচার্য একাদশ শতাব্দীতে অতি অস্পষ্টভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন সুতরাং তিনি নিউটনের সমতুল্য। অর্থাৎ নিউটন আর নূতন কি করিয়াছে? কিন্তু এই সমস্ত ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী’ শ্রেণীর তার্কিকগণ ভুলিয়া যান যে, ভাস্করাচার্য কোথাও পৃথিবী ও অপরাপর গ্রহ সূর্যের চর্তুদিকে বৃত্তাভাস (elliptical) পথে ভ্রমণ করিতেছে একথা বলেন না। তিনি কোথাও প্রমাণ করেন নাই যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও গতিবিদ্যার নিয়ম প্রয়োগ করিলে পৃথিবীর ও অপরাপর গ্রহের ভ্রমণ কক্ষ নিরূপণ করা যায়। সুতরাং ভাস্করাচার্য বা কোনো হিন্দু, গ্রিক বা আরবীয় পণ্ডিত কেপলার-গ্যালিলিও বা নিউটনের বহুপূর্বেই মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন, এরূপ উক্তি করা পাগলের প্রলাপ বই কিছুই নয়। দুঃখের বিষয়, দেশে এইরূপ অপবিজ্ঞানপ্রচারকের অভাব নাই, তাঁহারা সত্যের নামে নির্জলা মিথ্যার প্রচার করিতেছেন মাত্র।” 

১৯৩৯ সালে শান্তিনিকেতন একটি বক্তৃতায় মেঘনাদ সাহা আবার ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন সনাতনপন্থীদের - "হিন্দুর সৃষ্টিকর্তা একজন দার্শনিক। তিনি ধ্যানে বসিয়া প্রত্যক্ষ জগৎ, স্থাবর ও জঙ্গম, জীব ও ধর্মশাস্ত্রাদী সমস্তই সৃষ্টি করিয়াছেন। সেইজন্য যাহারা মাথা খাটায়, অলস দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনায় সময় নষ্ট করে এবং নানারূপ রহস্যের কুহেলিকা সৃষ্টি করে, হিন্দু সমাজে তাহাদিগকে বড় বড় স্থান দেওয়া হইয়াছে। শিল্পী, কারিগর ও স্থপতির স্থান এই সমাজে অতি নিম্নস্তরে এবং হিন্দু সমাজে হস্ত ও মস্তিস্কের পরস্পর কোনো যোগাযোগ নেই।"

১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ভবনে পরিকল্পনা কমিশনের সভায় যাবার পথে মেঘনাদ সাহা মারা যান। বিশেষ বিমানে তাঁর মৃতদেহ কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। সেদিন ছিল সরস্বতী পূজার দিন। নাস্তিক বিজ্ঞানীর মৃত্যু সংবাদে নাকি কলকাতার সমস্ত পূজা বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ।

লেখা - শিবাশীষ বসু ।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.