লেবাননের কূটনৈতিক উদ্যোগের মাঝেই দক্ষিণে ইসরায়েলের তীব্র হামলা। দক্ষিণ লেবাননে চারটি বাড়িতে বিমান হামলা, আলোচনার অগ্রগতির পরই উত্তেজনা বৃদ্ধি
লেবাননের সঙ্গে চলমান নাগরিক ও কারিগরি আলোচনার মাঝেই ইসরায়েল বৃহস্পতিবার নতুন করে দক্ষিণ লেবাননে চার দফা বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলার আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকায় ৩০০ মিটারের মধ্যে থেকে সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল চারটি বাড়ি, যার একটি ‘উত্তর লিটানি’ এলাকার মধ্যে।
এই হামলা আসে আলোচনার সর্বশেষ বৈঠক “মেকানিজম”–এর পরদিনই। বৈরুতের গণমাধ্যম জানিয়েছে, লেবাননের আলোচক দলের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন রাষ্ট্রদূত সিমোন করম। তাঁর দায়িত্ব—শত্রুতামূলক কার্যক্রম বন্ধ, বন্দি বিনিময়, দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলের সরে যাওয়া এবং ‘ব্লু লাইন’ সংশোধন বিষয়ে অগ্রগতি নিশ্চিত করা।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আওন পরিষ্কার করে বলেছেন, “লেবানন কোনো স্বাভাবিকীকরণ বা শান্তিচুক্তি করছে না।”
সরকারি বৈঠকে ‘আলোচনার পথ’ জোরালো
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রেসিডেন্ট আওন জানান, স্পিকার নাবিহ বেরি এবং প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের সঙ্গে আলোচনার পরই সিমোন করমকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রথম বৈঠক থেকে বেশি ফল আশা করা যায় না, কিন্তু এটি ১৯ ডিসেম্বরের পরবর্তী বৈঠকের পথ তৈরি করেছে। যুদ্ধের বদলে আলোচনার ভাষাই প্রাধান্য পেতে হবে।”
দক্ষিণে ‘একক অস্ত্রনীতি’ বাস্তবায়নে নতুন পদক্ষেপ
বৈঠকে সেনাপ্রধান জেনারেল রুডলফ হাইকেল দক্ষিণ লিটানি এলাকায় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সরকারের সিদ্ধান্তের মাসিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেনাবাহিনী জাতিসংঘের ইউনিফিল বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ লিটানি এলাকার একটি স্থান থেকে হিজবুল্লাহর রকেট জব্দ করেছে।
ইসরায়েলের দ্বৈত সংকেত: আলোচনা চলবে, হামলাও চলবে
লেবানন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করলেও ইসরায়েলের বিবৃতিতে পরস্পরবিরোধী বার্তা স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে তারা লেবাননের আলোচনামূলক পদক্ষেপকে ‘ইতিবাচক’ বলছে, অন্যদিকে জানিয়ে দিচ্ছে—সামরিক অভিযান কোনোভাবেই থামানো হবে না।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র অ্যাভিখাই আদরেই দক্ষিণ লিটানি–সংলগ্ন কয়েকটি গ্রামে জরুরি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং জানান যে হিজবুল্লাহর ‘সামরিক অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে শিগগিরই বড় ধরনের হামলা চালানো হবে।
পরে ইসরায়েল জানায়, তারা আবাসিক এলাকার ভেতরে থাকা অস্ত্রগুদাম লক্ষ্য করেছে—যা তাদের ভাষায় “বেসামরিক স্থাপনা সামরিক কাজে ব্যবহারের উদাহরণ।”
‘মাঠ ও টেবিল আলাদা’—এটাই ইসরায়েলের বার্তা
ইসরায়েল যে আলোচনাকে শুধুমাত্র সংঘাত ব্যবস্থাপনার একটি প্রযুক্তিগত ধাপ হিসেবে দেখছে, তার ইঙ্গিত মিলছে বৈরুতের আকাশে ইসরায়েলি ড্রোনের বাড়তি উপস্থিতি ও দক্ষিণে নতুন নতুন হুঁশিয়ারির মধ্য দিয়ে।
লেবাননের প্রভাবশালী রাজনীতিক আশরাফ রিফি বলেন, “পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আলোচনার অগ্রগতির মধ্যেও ইসরায়েলের বার্তাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে—তারা হিজবুল্লাহকে আঘাত হানা বন্ধ করবে না।”
তার মতে, “ইসরায়েলের বৃহত্তর কৌশল হলো অঞ্চলজুড়ে ইরানী প্রভাব হ্রাস করা। লেবানন যদি হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে না পারে, ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপ নেবে—এটি নতুন কিছু নয়।”
শান্তির সম্ভাবনা এখনো বাতিল নয়
অন্যদিকে, ড্রুজ–নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক দলের সংসদ সদস্য অ্যাকরাম শুহাইব তুলনামূলক আশাবাদী মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রশ্ন হলো—ইসরায়েল কি সত্যিই শান্তি চায়? তবুও, ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির কাঠামোতে ফিরে যাওয়া গেলে সেটি লেবাননের জন্য বড় অর্জন হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন, সিমোন করমকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্র–আরব দেশ ও ইউরোপীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুদ্ধের দিক থেকে লেবাননকে সরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চূড়ান্ত লক্ষ্য—১৭০১ বাস্তবায়ন
শুহাইব বলেন, “সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হলো জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ১৭০১—যেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বের আওতায় থাকবে একটিমাত্র সেনাবাহিনী ও একটিমাত্র অস্ত্র।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইসরায়েলকে আরেকটি আগ্রাসনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। যারা আজও অস্ত্র নিয়ে আলোচনায় আপত্তি করছে, তাদের উচিত রাষ্ট্রকে বাঁচাতে দায়িত্বশীল হওয়া।”