দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব কি চাপে? প্রকল্প বিলম্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে প্রশ্ন
দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের যে কৌশল নিয়েছিল চীন, তা এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেইজিংয়ের আঞ্চলিক নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই দশকে চীন অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের পর অঞ্চলটিতে চীনের ভূমিকাকে ঘিরে প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। তবে বাস্তব পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সিপিইসি প্রকল্পে ধীরগতি
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের আওতায় সড়ক, রেল ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মোট লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাস্তবায়ন অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। এ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হামলার ঘটনা চীনা প্রকৌশলী ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত এক দশকে চীনা নাগরিকদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা বিনিয়োগ সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আফগানিস্তানে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা
আফগানিস্তানেও চীনের বেশ কয়েকটি কৌশলগত বিনিয়োগ রয়েছে। লোগার প্রদেশের আইনাক তামা খনি প্রকল্প বহু বছর ধরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিলম্বিত। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে তেল উত্তোলন চুক্তি ও ওয়াখান করিডোর-সংক্রান্ত উদ্যোগও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় চীনা নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনা নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোও আফগানিস্তানে দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও অস্থিরতাকে বিনিয়োগের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কৌশলগত ভাবমূর্তির প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বিনিয়োগ কেবল অর্থনৈতিক নয়; এর সঙ্গে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যও জড়িত। তবে প্রকল্পে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি বা নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটলে তা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে চীনের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়া তালেবান-পাকিস্তান সংলাপ বা আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে চীনের সীমিত দৃশ্যমান ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবও আঞ্চলিক নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীন নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা এখন বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সিপিইসি যদি দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকটে পড়ে থাকে, তবে তা অন্যান্য অংশীদার দেশগুলোর কাছেও বার্তা দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সময়ে চীন কীভাবে নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশল সমন্বয় করে—সেটিই নির্ধারণ করবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব কতটা টেকসই হবে।