বিশ্ব খাদ্য দিবসে ইসলামের শিক্ষা- মফিকুল ইসলাম
আজ ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব খাদ্য দিবস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ১৯৪৫ সালে এই দিনটি প্রতিষ্ঠা করেছিল বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের প্রতিশ্রুতি স্মরণে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পরও পৃথিবী আজও এক গভীর খাদ্য বৈষম্যের শিকার। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের পেট ভরা খাবারের অধিকার রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজও লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটান।
ইসলামে রিজক মানে শুধু খাদ্য বা অর্থ নয়, এটি আল্লাহর দেওয়া সকল সুবিধা- স্বাস্থ্য, সময়, পরিবার, এমনকি জ্ঞানও। ইসলাম রিজিককে শুধুমাত্র অর্থ বা খাদ্যের সমার্থক হিসেবে দেখেনি। বরং এটি জীবনের প্রতিটি প্রয়োজন- খাদ্য, পানি, পোশাক, জ্ঞান, স্বাস্থ্য ও শান্তি, সবকিছুর সমষ্টি। কুরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, তাদের রিজক আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। তিনি জানেন তাদের থাকার স্থান এবং তাদের সংরক্ষণের স্থান। সবকিছু সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ” (সুরা হুদ: ৬)। এই আয়াতটি আমাদের হৃদয়ে একটি গভীর শান্তি দেয় যে আল্লাহ কখনো তাঁর সৃষ্টিকে ভুলে যান না। কল্পনা করুন, একটি ছোট পাখি সকালে খালি পেটে বেরিয়ে পড়ে, কিন্তু সন্ধ্যায় পূর্ণ হয়ে ফিরে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যদি তোমরা আল্লাহর উপর সঠিকভাবে নির্ভর করতে, তাহলে তোমাদের রিজক দেওয়া হতো যেমন পাখিদের দেওয়া হয়। তারা সকালে খালি পেটে বেরিয়ে পড়ে এবং সন্ধ্যায় পূর্ণ পেটে ফিরে” (তিরমিযি)।
দুঃখজনকভাবে, আজকের পৃথিবীতে রিজকের এই Divine Promise সত্ত্বেও, মানুষের সৃষ্ট সংকটের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধার্ত। FAO-এর SOFI 2025 রিপোর্ট অনুসারে, 2024 সালে বিশ্বব্যাপী 673 মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার সম্মুখীন হয়েছে। আরও ভয়াবহ যে, 2.3 বিলিয়ন মানুষ (28%) খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে। আফ্রিকায় ক্ষুধা বাড়ছে, যেখানে অ্যাঙ্গোলা, ইথিওপিয়া এবং সিয়েরা লিওনে অপুষ্টি এবং স্টান্টিং (বৃদ্ধি বাধা) বেড়েছে। ওয়েস্টার্ন এশিয়ায় 12.7% জনসংখ্যা, অর্থাৎ 39 মিলিয়নের বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটায়। বিশ্বের ধনী-গরিবের খাদ্য প্রাপ্তির বৈষম্য এখন ঐতিহাসিক মাত্রা ছুঁয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ধনী ২০% জনগণ মোট খাদ্যের ৮০% ভোগ করে, আর বাকি ৮০% মানুষ ভাগ পায় মাত্র ২০% খাদ্যের।
মুসলিম-মেজরিটি দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও হৃদয়বিদারক। আরব রিজিয়নে 186.5 মিলিয়ন মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তাই ভুগছে, যা গত বছরের তুলনায় 1.1% বেড়েছে। পৃথিবীর ৫৭টি মুসলিম-মেজরিটি দেশগুলোতে 600 মিলিয়নের বেশি মানুষ খাদ্য অভাবে ভুগছেন। জাতিসংঘের মতে, গাজার বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতিতে ২০ লাখের বেশি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছে, এবং হাজার হাজার শিশু কেবল দুধের অভাবে মারা যাচ্ছে। কল্পনা করুন, একটি শিশু যার চোখে ক্ষুধার ছায়া, যে রাতে পেট চেপে ঘুমায়- এটি কি আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয় না?
এই পরিসংখ্যান আমাদের আধুনিক সভ্যতার এক ভয়াবহ বৈপরীত্যের ছবি তুলে ধরে। FAO-র সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিশ্বে প্রায় ৭৩.৫ কোটি মানুষ প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাবার পায় না। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন নিয়মিত ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। অন্যদিকে প্রতিবছর প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় হয় যা আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুধার্ত মানুষদের প্রতিদিন খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট। UNEP অনুসারে, 2022-এ বিশ্বে 1.05 বিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় হয়েছে রিটেল, ফুড সার্ভিস এবং হাউসহোল্ড সেক্টরে। গ্লোবালি, 13.2% খাদ্য হারায় হার্ভেস্ট থেকে রিটেল পর্যন্ত, এবং 19% হাউসহোল্ডে অপচয় হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন “তোমাদের কেউ যেন এমনভাবে খাবার না ফেলে যে এক কণাও অপচয় হয়। কারণ তুমি জানো না, সেই কণাতেই তোমার জন্য বরকত থাকতে পারে।” (সহীহ মুসলিম)। এই শিক্ষা আধুনিক পরিবেশ ও খাদ্য সংরক্ষণ নীতির সঙ্গেও আশ্চর্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নবী করিম ﷺ খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন ও ক্ষুধার্তদের প্রতি সহানুভূতির যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা আজকের দুনিয়ার মানবিক সংকট সমাধানের দিকনির্দেশনা হতে পারে। একটি সহীহ হাদীসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন “সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। এই হাদীসটি মুসলিম সমাজকে শুধু দানশীলতার নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা দেয়। ইসলামে খাদ্য বণ্টন শুধু দান নয়, এটি ন্যায় প্রতিষ্ঠার অংশ।
ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি হচ্ছে ‘রিজিক সবার জন্য’, এবং ‘সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মধ্যে ঘুরে না বেড়ায়।’ (সূরা হাশর, আয়াত ৭)। এই নীতির ভিত্তিতে ইসলামী সমাজে যাকাত, সদকা, ফিতরা, ওয়াকফ ইত্যাদির মাধ্যমে খাদ্য ও সম্পদ বণ্টনের একটি ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। উদাহরণস্বরূপ, খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের আমলে (৮ম শতকে) এমন অবস্থা হয়েছিল যে, বৈতুলমাল থেকে যাকাত গ্রহণ করার মতো কোনো গরিব মানুষই অবশিষ্ট ছিল না কারণ সমাজে খাদ্য ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়েছিল।
এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো জীবনের গল্প। একটি মা যে তার সন্তানকে এক মুঠো খাবার দিতে পারে না, তার চোখের জল কি আমরা অনুভব করি না? আজ যখন পৃথিবীর একদিকে বিলাসিতার ভোজ চলছে, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ শিশু না খেয়ে ঘুমায়। তখন ইসলামের শিক্ষা আমাদের অন্তরের গভীরে কাঁপন তোলে। ইসলাম আমাদের শেখায় যে রিজক শুধু নেওয়ার নয়, ভাগ করে নেওয়ার। রাসুল (সা.) বলেছেন: “সদকা সম্পদ কমায় না” (মুসলিম)। আজকের এই দিবসে, আমরা যদি হাতে হাত রেখে কাজ করি, তাহলে কতটা পরিবর্তন আনতে পারি! যখন আমরা অন্যের ক্ষুধা বুঝি, অপচয় রোধ করি, এবং হালাল উপার্জনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বণ্টন নিশ্চিত করি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “সর্বোত্তম মানুষ সে, যে অন্য মানুষের উপকারে আসে।” (আল-মু’জাম আল-আওসাত, হাদীস ৬১৯২)।
বিশ্ব খাদ্য দিবস কেবল ক্ষুধার পরিসংখ্যান নয়; এটি মানবতার এক আত্মজিজ্ঞাসা। আমরা কি রিজিকের প্রকৃত অর্থ বুঝেছি? আমরা কি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের মর্যাদা দিতে শিখেছি? ইসলামের আহ্বান স্পষ্ট, অপচয় নয়, ভাগাভাগি; লোভ নয়, কৃতজ্ঞতা; অবহেলা নয়, দায়িত্ববোধ। যদি মুসলিম সমাজ কোরআন-হাদীসের এই শিক্ষা আন্তরিকভাবে ধারণ করে, তবে শুধু নিজেদের নয়, পৃথিবীরও ক্ষুধা ও বৈষম্যের অবসান সম্ভব।