লিবিয়ায় অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
লিবিয়ায় ২০১১ সাল থেকে আরোপিত আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ছয় মাসের জন্য লিবিয়ার জলসীমায় যাতায়াতকারী জাহাজে তল্লাশির অনুমতি নবায়ন করেছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি নজরে রাখতে চাইলেও, বহু পর্যবেক্ষকের মতে নিষেধাজ্ঞা নিয়মিতভাবেই লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং এর বাস্তব প্রভাব খুবই সীমিত।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ভোটে নিরাপত্তা পরিষদ ইউরোপীয় নৌবাহিনীর ‘ইরিনি’ মিশনের কার্যক্রম আর ছয় মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়, জাহাজে তল্লাশি চালাতে হলে ‘যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ’ থাকতে হবে। যদিও সাধারণত এই ধরনের ম্যান্ডেট এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়, এবার মাত্র ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে রাশিয়া ও চীন আপত্তি জানিয়েছে।
‘ইরিনি’ কার্যত সীমিত ক্ষমতার একটি মিশন: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মেয়াদ বাড়ানো মূলত ‘প্রতীকি পদক্ষেপ’ ছাড়া কিছু নয়। লিবিয়ার সামরিক বিশ্লেষক মোহামেদ তোরহুনি বলেন, “এই নিষেধাজ্ঞা কখনোই কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়নি। আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলো নিয়মিতই পশ্চিম লিবিয়ায় অস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহের ঘটনা তুলে ধরছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহামেদ মাহফুজ জানান, লিবিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পক্ষ নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য অঘোষিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। এতে সংঘর্ষের সময় নতুন ধরনের ও উন্নতমানের অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণও মিলছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ‘ইরিনি’ ৭৯টি প্রাথমিক যোগাযোগ, ৫২টি বন্ধুত্বপূর্ণ সংযোগ এবং মাত্র দুটি তল্লাশি কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, নিষেধাজ্ঞা আরও কার্যকর করতে পদক্ষেপ জোরদার করা জরুরি।
‘ইরিনি’ মিশনের কমান্ডার অ্যাডমিরাল মারকো কাসাবিয়েরি জানিয়েছেন, তাদের মিশন একটি ক্রমাগত জটিল ‘হাইব্রিড হুমকি’-র সম্মুখীন, এবং সফলতার জন্য আরও গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন।
জাতিসংঘে বিভক্ত অবস্থান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দাবি করেছে—‘ইরিনি’ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সহায়তা করছে। অন্যদিকে রাশিয়ার মতে, অস্ত্র পাচার এখনও অব্যাহত। চীন ভোটদানে বিরত থেকে মিশনের ‘স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার অভাব’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
লিবিয়ার গবেষক জালাল হারশাউই বলেন, সাবেক জাতিসংঘ দূত স্টেফানি উইলিয়ামস যে নিষেধাজ্ঞাকে ‘একটি রসিকতা’ বলেছিলেন, তা এখনও সত্যি। তিনি মনে করেন, তুরস্ক ও রাশিয়া থেকে নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহের ঘটনা নতুন করে প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
লিবিয়ার লেখক মোস্তফা আল-ফিতুরি জানান, “ইরিনি তাদের রিপোর্ট নিরাপত্তা পরিষদে পাঠায়, কিন্তু পরিষদ কিছুই করে না। তারা জানে কোন কোন দেশ নিষেধাজ্ঞা ভাঙছে, কিন্তু ব্যবস্থা নেয় না।”
প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ প্রশ্ন: নিরাপত্তা পরিষদ এ বছরের শুরুতে মানবিক সাহায্যবাহী সামরিক জাহাজ ও বিমানকে ছাড় দেয়। পাশাপাশি লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনুমতি দেয়, যাতে সামরিক প্রতিষ্ঠানের একীকরণ সম্ভব হয়। কিন্তু তবুও লিবিয়ার সব পক্ষ বিভিন্ন উৎস থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করছে।
বিশ্লেষক মাহফুজের মতে, “অস্ত্র প্রবাহ বন্ধ করতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রকৃত সদিচ্ছা প্রয়োজন। সব পক্ষের বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ইচ্ছা না থাকলে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
ছবি: সংগৃহীত