Tranding

নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫: বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে "গণতন্ত্রের রক্ষাকর্ত্রী"

সম্প্রতি ঘোষিত নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা একদিকে যেমন বিস্ময়ের, তেমনি গভীর হতাশারও। বিশ্বের বহু মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন—এই পুরস্কার কি সত্যিই ন্যায়-নীতির মানদণ্ডে দেওয়া হয়েছে, নাকি এটি হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং পশ্চিমা শক্তির মতাদর্শিক মদতের প্রতীক?

আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুবার নিজেকে নোবেল পুরস্কারের যোগ্য প্রার্থী হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি এই গৌরব অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটিই অনেক শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে স্বস্তির বিষয়। কিন্তু সমস্যা হলো—এই বছর যাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হলো, তাঁর কার্যকলাপ, মতাদর্শ এবং অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে আরও বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে ক্ষমতার লালসা?

নোবেল কমিটি যে ভদ্রমহিলাকে "গণতন্ত্রের রক্ষাকর্ত্রী" বলে তুলে ধরেছে, বাস্তবে তিনি গণতন্ত্রের ‘গ’-ও বোঝেন কিনা, তা নিয়েই আজ সন্দেহ প্রকাশ করছে বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। ২০১০ সালের কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট কিংবা কিছু বক্তৃতাকে সামনে রেখে তাঁকে গান্ধীবাদী বলে প্রচার করা হচ্ছে, অথচ বাস্তবে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও বক্তব্য বারবার হিংসা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের পথে পরিচালিত হয়েছে।

উদাহরণ স্বরূপ, যদি ভাবা যায়—ভারতের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বিদেশি শক্তিকে আহ্বান করেন, যেন তারা সেনা অভিযান চালিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন, তাহলে দেশের মানুষ তাঁকে দেশপ্রেমিক বলে ভাববেন তো? উত্তর যদি "না" হয়, তাহলে এই ভদ্রমহিলার নোবেল পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয়—তিনি কীভাবে গণতন্ত্রের পক্ষপাতী?

বিদেশি হস্তক্ষেপের এক সুপরিচিত মুখ

এই ভদ্রমহিলা অতীতে বারবার ইজরায়েল ও আমেরিকাকে নিজের দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। ২০০২ সালের “কারমোনা ডিক্রী”-তে স্বাক্ষর করে ভেনেজুয়েলার সংবিধানকে উপেক্ষা করে স্বৈরতন্ত্রকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে হুগো চাভেজ ও তাঁর উত্তরসূরিদের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র, যেগুলোর পিছনে ছিল বিদেশি মদত ও আমেরিকার সমর্থন।

বিশ্ব মিডিয়াকে ব্যবহার করে, বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলার ঢেলে তাঁকে গণমানুষের নেত্রী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে তিনি কখনোই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন পাননি। বরং তাঁকে ঘিরে রয়েছে "আমেরিকার দালাল" হওয়ার তকমা।

নোবেল কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে নোবেল কমিটির নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। একজন নেত্রী, যিনি প্রকাশ্যে আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেন, দেশের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপের আবেদন জানান, এবং ইজরায়েলের আগ্রাসী নীতির প্রবক্তা—তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া নিঃসন্দেহে নোবেল পুরস্কারের মূল দর্শনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তাঁর এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে খুশি হয়েছেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মতো নেতারা। এমনকি তিনি নিজে এই পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছেন। এটা কি শান্তির পথে অগ্রগতি, নাকি সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের গোপন সমর্থন?

ভেনেজুয়েলার মানুষের প্রতিক্রিয়া

সবচেয়ে বড় কথা—তাঁর নিজের দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষত গরীব, প্রান্তিক ও গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষজন এই সম্মানকে অপমান হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের চোখে তিনি একজন বিশ্বাসঘাতক, একজন আমেরিকার হাতের পুতুল।

ভেনেজুয়েলার গরীব মানুষের স্বপ্ন ছিল নিজের দেশের সম্পদ নিজের দেশের উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে। অথচ এই নেত্রীর রাজনীতি ছিল সেই সম্পদকে বহুজাতিক কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার পথে হাঁটার রাজনীতি।

উপসংহার

নোবেল শান্তি পুরস্কার পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কারগুলোর একটি। কিন্তু যখন সেই পুরস্কার এমন একজন ব্যক্তিকে দেওয়া হয়, যাঁর রাজনীতির ভিত্তিই গঠিত হয় হিংসা, হস্তক্ষেপ এবং ক্ষমতার লোভের ওপর, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই পুরস্কারের মূল্য আর কতটা আছে?

এবারের শান্তি পুরস্কার, প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে এক গাঢ় হতাশা সৃষ্টি করেছে। নোবেল কমিটি যদি সত্যিকারের শান্তি ও গণতন্ত্রের পক্ষে থাকে, তাহলে তাদের আরও সতর্ক ও নিরপেক্ষ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। অন্যথায়, এই পুরস্কার একসময় শুধুই রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠবে—যা থেকে দূরে রাখতেই আলফ্রেড নোবেল এটি প্রবর্তন করেছিলেন।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.