গাজায় যুদ্ধবিরতির এক মাস: শান্তি এসেছে আংশিক, কিন্তু জীবনের দুর্ভোগ রয়ে গেছে আগের মতোই। ক্ষুধা, পানি ও জ্বালানি সংকটে জর্জরিত ২৪ লাখ মানুষ
গাজা উপত্যকায় সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বোমাবর্ষণ কিছুটা থেমেছে বটে, কিন্তু বেঁচে থাকার লড়াই এখনো আগের মতোই কঠিন। গত ১০ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। এর আওতায় সীমান্তপথে মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। ধারণা করা হয়েছিল, এতে হয়তো গাজাবাসীর দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে — ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পানির অভাব প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
গাজার পশ্চিমাঞ্চলের শাতি শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী আহমেদ আল-হুসি (৫১) প্রতিদিন ২০ লিটার বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ান। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি দিন কাটান সীমিত পানির জোগানে। প্রতি তিন দিনে একবার তারা মাত্র ২৫০ লিটার পানি পান — যা সাধারণ পরিস্থিতিতে এক দিনের প্রয়োজন মেটাতেও অপ্রতুল। আহমেদ বলেন, “যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু দুর্ভোগ কমেনি। আমরা এখনো পানির জন্য কাতর। আমাদের শুধু একটু নিরাপদ পানি চাই— যাতে অন্তত স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারি।” যুদ্ধের সময় পানির অভাবে মহামারি ও সংক্রমণ বেড়েছিল। সেই দুর্দশা এখনো কাটেনি।
গাজায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ। ফলে হাজারো পরিবার কাঠ বা ঘরের ভাঙা আসবাব জ্বালিয়ে রান্না করতে বাধ্য। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে দেখা গেছে, নারীরা গাছের ডালপালা সংগ্রহ করছেন চুলা ধরানোর জন্য। উত্তর গাজার শেখ রিদওয়ান এলাকার বাসিন্দা রানিয়া রিদওয়ান (৪৪) বলেন, “আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এখন স্কুলের এক কক্ষে আশ্রয়ে থাকি। গ্যাস পাওয়া যায় না, তাই প্রতিদিন কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করি। এতে প্রচুর ধোঁয়া হয়, বাচ্চাদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে।” গ্যাসের সংকটে কালোবাজারে দাম আকাশছোঁয়া— এক কেজি গ্যাসের দাম ২০০ শেকেল (প্রায় ৬২ ডলার), যা যুদ্ধের আগে ছিল ৬০ শেকেল (১৮ ডলার)। ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে গ্যাস ও জ্বালানি প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ রাখে, এবং বর্তমানে সীমিত পরিমাণে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে সপ্তাহে এক বা দুই দিন। এর ফলে ডিজেলের দামও হু-হু করে বেড়েছে— এক লিটার এখন ৫০ শেকেল (১৫ ডলার), যা আগে ছিল ৮ ডলার। ফলে গণপরিবহনের ভাড়াও বেড়ে গেছে।
গাজার তরুণ ওয়াসিম হামদান (২৬) বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম যুদ্ধবিরতির পর জীবন স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এখন আমরা যেন ব্যবসায়ীদের দয়ায় বেঁচে আছি। দাম নিয়ন্ত্রণের কেউ নেই।” অন্যদিকে নুসাইরাত শিবিরের তরুণী সুমর আল-মিনাওয়ি জানান, “প্রতিদিন বাজারে যাই, কিন্তু প্রতিবার দাম আলাদা। কিছু পণ্য পাওয়া গেলেও দাম এত বেশি যে কেনা কঠিন। যুদ্ধ থামলেও জীবনযাত্রায় কোনো পার্থক্য নেই।”
গাজার সরকারি তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪,৪৫৩টি ট্রাক মানবিক সাহায্য নিয়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে নির্ধারিত ছিল ১৫,৬০০টি। প্রতিদিনের গড় প্রবেশের কথা ৬০০ ট্রাক হলেও বাস্তবে আসছে মাত্র ১৭১টি। এই ট্রাকগুলোর মধ্যে ছিল ৩১টি ট্রাক রান্নার গ্যাস এবং ৮৪টি ট্রাক ডিজেল, যা রুটি কারখানা, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ জেনারেটরের জন্য নির্ধারিত। গাজার সরকার বলছে, ইসরায়েল এখনো ‘নিয়ন্ত্রিত সংকট’ তৈরি করে রাখছে— সীমিত সাহায্য দিয়ে জনজীবনে চাপ বাড়িয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা চলছে।
নুসাইরাত এলাকার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এক ফিলিস্তিনি মা তার শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন। চারপাশে ভাঙা ঘর, ছাই ও ধুলো। তাঁর মুখে একটাই প্রশ্ন— “যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু শান্তি কোথায়?” গাজার এই প্রশ্ন আজও উত্তরহীন— বোমা থেমেছে, কিন্তু দুর্ভোগ নয়।