ফিলিস্তিন: কষ্টিপাথরে দাঁড়িয়ে বিশ্ব বিবেক- আমিন ইবনে মোজাফফার
গ্রেটা থুনবার্গকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে হেনস্থার খবর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার সদস্য এরসিন সেলিকের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে গ্রেটাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ইসরায়েলি পতাকায় চুম্বন করতে বাধ্য করা হয়েছে, মারধর করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত খাবার ও জল থেকেও বঞ্চিত রাখা হয়েছে। একজন আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটি যদি এইরকম হেনস্থার শিকার হতে পারেন, তবে প্রতিদিন যে অমানবিকতা গাজার সাধারণ মানুষকে সহ্য করতে হয়, তা কল্পনাতীত।
ইসরায়েল কোনও ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র নয়—এমন আচরণ তার চরিত্রের অন্তর্নিহিত অংশ। বছর দুয়েক আগে নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা জিপি নাভোন প্রকাশ্যে বলেছিলেন, গাজার মানুষকে হত্যা না করে জীবিত রেখে বাড়ি বাড়ি ঢুকে নির্যাতন করা হোক, যাতে ইসরায়েলিরা তাঁদের আর্তনাদ উপভোগ করতে পারেন। এই বক্তব্য শুধুই এক ব্যক্তির বিকৃত মনোভাব নয়; বরং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিফলন।
অনেকে বলার চেষ্টা করেন এই সংঘাত শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা, প্রথম "নকবা", সেখান থেকেই শুরু ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এই লড়াই চলছে। কখনও আরাফতের পিএলও, কখনও হামাস, কখনও পিএফএলপি কিংবা ডিএফএলপি—কেউ না কেউ এই আন্দোলনের ছায়া হয়ে থেকেছে। একই সঙ্গে গাজার তরুণ প্রজন্ম মতাদর্শের তোয়াক্কা না করে হাতে তুলে নিয়েছে বন্দুক কিংবা পাথর।
ইসরায়েল যে গণহত্যা চালাচ্ছে, তার প্রমাণ রয়েছে সংখ্যাতেই। কেবল ২০১৮ সালে নিহত হয়েছেন ২৯৯ জন, ২০১৯ সালে ১৩৩ জন, ২০২১ সালে ৩১৩ জন, ২০২২ সালে ২০৪ জন। শয়ে শয়ে মানুষ নিহত হন প্রতি বছর, যাদের অনেকেই শিশু। তাই ফিলিস্তিনি জনগণ নয়, বরং ইসরায়েলই যুদ্ধের নামে একতরফা হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। ঠিক যেমন ক্ষুদিরাম বা ভগৎ সিং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেননি, বরং নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন—ফিলিস্তিনিরাও তাই করছেন।
আজকের এই সংগ্রাম কেবল ফিলিস্তিনের নয়, গোটা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের। ভিয়েতনামে যখন নাপাম বোমা ঝরছিল, তখন যেমন লন্ডন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক কিংবা কলকাতা রাস্তায় নেমেছিল যুদ্ধবিরোধী জনস্রোতে, আজ তেমনই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। ইতালির শ্রমিকরা ধর্মঘটে দেশ স্তব্ধ করছেন, গ্রীসের ছাত্র-শ্রমিকরা বন্দর অবরোধ করছেন, যাতে ইসরায়েলে অস্ত্র পাঠানো না যায়। বার্লিন, ব্রাসেলস, প্যারিস থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াতে।
এই সংগ্রামে ধর্ম নয়, মানুষই মুখ্য। ফিলিস্তিনি পপুলার ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ হাবাশ ছিলেন খ্রিস্টান। গাজার চার্চগুলো বড়দিনে আলো জ্বালাতে অস্বীকার করেছে গণহত্যার প্রতিবাদে। বিশ্বজুড়ে বহু ইহুদিও এই লড়াইয়ের শরিক—লন্ডন কিংবা নিউ ইয়র্কের মিছিলে তাঁদের হাতে দেখা যাচ্ছে ফিলিস্তিনের পতাকা। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে যাওয়া পরিবারগুলির উত্তরসূরীরাও আজ জায়নবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন।
সত্য এটাই—ফিলিস্তিন আজকের পৃথিবীর কষ্টিপাথর। এই কষ্টিপাথরে পরীক্ষা হচ্ছে মানবতা। আপনি গণহত্যার বিরুদ্ধে, নাকি পক্ষে? মাঝামাঝি কিছু নেই। কোনও মতাদর্শ, কোনও দল, কোনও রাষ্ট্র—কিছুই এই প্রশ্নের থেকে বড় নয়।
ফিলিস্তিনের লড়াই তাই কেবল এক ভূখণ্ডের মুক্তিযুদ্ধ নয়, এটি মানবসভ্যতার মুক্তির লড়াই। পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের এক কণ্ঠে উচ্চারণ করা দরকার: আমরা ফিলিস্তিনের পাশে, আমরা গণহত্যার বিরুদ্ধে।