|
সম্পাদকীয়:জাতিসংঘের মঞ্চে এবার যেন ইতিহাস নতুন করে লেখা হলো। বহু দশকের দ্বিধা, ব্যর্থ আলোচনার পর অবশেষে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে উঠে এলো স্পষ্ট বার্তা—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কোনো পুরস্কার নয়, বরং এক অবিচ্ছেদ্য অধিকার।
সৌদি আরব ও ফ্রান্সের যৌথ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্যারিসের প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি, এবং ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আরও কয়েকটি দেশের সমর্থন—এসব এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে এই স্বীকৃতিগুলো যেন বহুদিনের অচলাবস্থায় আলো দেখাচ্ছে।
কিন্তু এই স্বীকৃতির উচ্ছ্বাসের মাঝেও রয়েছে বাস্তবতার কণ্টকপথ। গাজায় ধ্বংসস্তূপ, নিরপরাধ মানুষের রক্ত, এবং পশ্চিম তীরে চলমান দখল ও বসতি স্থাপন কার্যক্রম এখনো শান্তিকে দূর স্বপ্ন করে তুলেছে। ইসরায়েলের নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে এই স্বীকৃতিকে ‘হামাসকে পুরস্কৃত করা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়া যে তীব্র হবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়।
ফিলিস্তিনি নেতৃত্বও বুঝতে পারছে, শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না। শাসনব্যবস্থার সংস্কার, স্বচ্ছতা, এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে না পারলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আস্থার জায়গা হারাবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধ থামানো। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর বক্তব্য, “শান্তির সময় এসেছে”—তা কেবল কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব প্রয়োজন। হামাস দুর্বল হলেও গাজার রক্তপাত অব্যাহত; এ পরিস্থিতি শুধু শান্তির সম্ভাবনাকে ক্ষয় করছে না, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এখন প্রশ্ন—এই সম্মেলন কি কেবল আরেকটি ঘোষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই নতুন বাস্তবতা গড়ে তুলবে? ইতিহাস সাক্ষী, অজস্র প্রস্তাব ও আলোচনার ভিড়ে ফিলিস্তিনের স্বপ্ন বহুবার অপূর্ণই থেকেছে। তবে এবার যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কথার পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ নেয়—দখলদারিত্বের অবসান, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা, এবং প্রকৃত আন্তর্জাতিক তদারকি—তাহলেই শান্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
সম্মেলনের মঞ্চ থেকে উঠে আসা বার্তাটি তাই স্পষ্ট: ন্যায় ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়। আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হলো—একটি স্বাধীন, স্বশাসিত, কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। বিশ্ব যদি সত্যিই এই মুহূর্তকে “ঐতিহাসিক সুযোগ” বলে মনে করে, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্বও বিশ্বকেই নিতে হবে
|