সংগঠিত প্রতিরোধের ডাক: ইউরোপের ধর্মঘটে পুঁজির বিরুদ্ধে নবজাগরণ
গাজা ও ফ্লোটিলার প্রতি সংহতির যে আন্দোলন ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিছক আন্তর্জাতিক সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি শ্রমিক ও ছাত্র আন্দোলনের নতুন যুগের সূচনাও বটে। ইতালি, গ্রিস, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ব্রাসেলস থেকে ইস্তানবুল—সর্বত্র রাস্তায় নেমে এসেছে শ্রমজীবী মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম। ইতালির রোম, মিলান, নেপলস, জেনোয়ায় হাজার হাজার শ্রমিকের মিছিল এবং ট্রেড ইউনিয়নের ডাকে দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট—এই সবই এক গভীর অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে গ্রিসে, যেখানে ডানপন্থী সরকার ৮ ঘণ্টার কর্মদিবসকে ভেঙে ১৩ ঘণ্টা করার উদ্যোগ নিয়েছে। সপ্তাহে দুইদিনের ছুটির পরিবর্তে একদিনের প্রস্তাবও এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের ইউনিয়ন একজোট হয়ে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকে। কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র সংগঠনগুলির সক্রিয় সমর্থনে গোটা দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি আমাদের দেশের বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। এখানে ধর্মঘট মানেই ‘অচলাবস্থা’—এই ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করেছে মূলধারার মিডিয়া। মালিকরা যখন শ্রমিকদের মজুরি আটকে রাখে, হঠাৎ কারখানা বন্ধ করে দেয়, বা চা-বাগানে উৎপাদন থামিয়ে দেয়, তখন সেটি আর ‘অচলাবস্থা’ নয়, বরং নীরব চুপচাপ সহ্য করার কথা বলা হয়।
আজকের ঢাকা বা কলকাতার কর্পোরেট অফিসে শ্রমিকরা দৈনিক ১২–১৪ ঘণ্টা কাজ করে, ওভারটাইম ছাড়াই। চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী কর্মীরা প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে বাঁচেন। বসের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করলেই চাকরি হারানোর ভয়। এইসব খবর হয় না। কিন্তু শ্রমিক রাস্তায় নামলেই সেটি ‘হাঙ্গামা’ হিসেবে চিত্রিত হয়।
গ্রিস ও ইউরোপ দেখিয়ে দিয়েছে—শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই একমাত্র পথ। ক্ষমতা চায় শ্রমিক শ্রেণি সংগঠিত না হোক, কারণ সংগঠিত মানুষ ভয়ঙ্কর।
হ্যাঁ, প্রতিরোধে ঝুঁকি আছে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, পরিবর্তন এসেছে কেবল তখনই, যখন শ্রমিকরা রাষ্ট্র ও পুঁজির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছে।
আজকের দিনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলা দরকার—মজুরি-দাসের ক্রোধ পবিত্র। এই ক্রোধই ন্যায়ের পক্ষে বিদ্রোহের শক্তি।