সৈয়দ মুজতবা আলী: রম্যের রাজপুত্র, আড্ডার জাদুকর, বাংলা সাহিত্যের বিশ্বকণ্ঠ
ডা. এ, কালাম ( বারাসাত) - ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শুধু লেখেন না, জীবনকেও লিখে যান—প্রতিটি হাঁটায়, কথায়, প্রশ্নে এবং ঠাট্টায়। তাঁদের একজন, বরং অগ্রগণ্য হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁকে মনে পড়লেই মনে পড়ে এক অনন্য রসবোধ, দূরদর্শী পাণ্ডিত্য, আর সাহিত্যের গন্ধে মেশানো এক জীবন্ত চিন্তার ধারা। তিনি ছিলেন এমন এক লেখক, যাঁর প্রতিটি বাক্যে জেগে ওঠে কৌতুকের মোড়কে সমাজচেতনা, আর সাহিত্যের গাঢ় অন্তরঙ্গতা।
১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সিলেটে তাঁর জন্ম। আজ যেটি বাংলাদেশের অন্তর্গত। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল বিস্ময়করভাবে বিচিত্র ও বহুবর্ণ। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের ছায়ায় শুরু, তারপর জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ও ইসলামিক সংস্কৃতি চর্চা, এবং শেষে আলিগড় ও দিল্লি হয়ে বাংলা সাহিত্যে ফিরে আসা। এই বিস্তৃত শিক্ষা তাঁকে শুধু পাণ্ডিত্য দেননি, তাঁকে করে তুলেছিল এক বিশ্বদর্শী চিন্তাশীল মানুষ। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি, আরবি, ফরাসি ও জার্মান—এই আটটি ভাষায় তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়।
তাঁর সাহিত্যজীবন ছিল নিজ অভিজ্ঞতার একটি অভিজ্ঞানচিত্র। তাঁর রম্যরচনাগুলি নিছক হাসির খোরাক নয়—তার গভীরে ছিল জীবনদর্শনের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও মানবিক উষ্ণতা। “দেশে দেশে” তাঁর আফগানিস্তান যাত্রার নথি হলেও, তা যেন এক বিশ্বজনীন সাহিত্যের পাঠ। “পাঁচটি রত্ন”, “চাচা-কাহিনি” কিংবা “শবনম”—প্রতিটি লেখাতেই তিনি নিজের দেখা দেশ, মানুষ আর সংস্কৃতির বর্ণনা দিয়েছেন অনায়াস সাবলীলতায়।
তিনি একবার বলেছিলেন— “লেখা মানে শুধু গল্প বলা নয়, লেখা মানে হলো—হাসির মুখোশ পরে চোখের জল লুকিয়ে দেওয়া।” এ বাক্যে যেন লুকিয়ে আছে তাঁর সমগ্র সাহিত্যভাবনার সারাংশ।
মুজতবা আলী ছিলেন রসিকতায় সিদ্ধহস্ত। আড্ডা ছিল তাঁর জীবনের অনিবার্য অঙ্গ। একবার শুনে ফেললেন, ‘রাউন্ড’ শব্দের বাংলা হয়েছে ‘রোঁদ’। সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করলেন, “তবে কি ‘পাউন্ড’-এর বাংলা হবে ‘পাঁউদ’?” শান্তিনিকেতনে একদল দর্শনার্থীর কাছে জানতে চাইলেন—“ক্ষিতিমোহনবাবু দেখেছেন? নন্দলাল বসু? হরিচরণ?” সবাই বলল, “হ্যাঁ।” তিনি ঠাট্টার ছলেই বললেন—“তাহলে বুঝি বাঘ-সিংহ সব দেখে, এখন খট্টাশটাকে দেখতে এসেছেন!”
এই ছিল তাঁর ব্যঙ্গ আর বুদ্ধির সম্মিলিত ভঙ্গি—হালকা মনে হলেও গভীর ইঙ্গিতবাহী।
তিনি নিজেকে বলতেন “ফাজিল”—বাংলা অর্থে নয়, বরং আরবি অর্থে—পাণ্ডিত্যপূর্ণ। অথচ তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল রঙহীন জাহিরের বিপরীতে; সবটা ধরা পড়ত তাঁর লেখার অন্তর্নিহিত কৌতুকে। জীবনের অভিজ্ঞতা, ভাষাজ্ঞান ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছিল এক অনন্য বোধসম্পন্ন লেখকসত্তা।
তাঁর মতে, সাহিত্য হওয়া উচিত সহজ এবং সৎ। তিনি বলতেন— “লেখা যেন হয় দরজার মতো—খুলে দিলে আলো আসবে, বন্ধ করলে ছায়া।” তাঁর লেখার ভাষা ছিল সহজ, অথচ গম্ভীর নয়; কৌতুক ছিল, কিন্তু নিছক হাস্যরসের জন্য নয়; এবং বক্তব্য ছিল, যা কখনও চোখ ভিজিয়ে দিত অজান্তেই।
আজ তাঁর জন্মদিনে মনে পড়ে সেই আত্মমগ্ন অথচ মানবমুখী লেখাগুলি। মনে পড়ে তাঁর প্রতিটি রচনার ভেতরকার একান্ত নিজস্ব স্বর—যা পাঠকের সামনে খুলে ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ একটি আলাপন। তাঁর কলমে শব্দেরা কেবল হাসত না, মাঝে মাঝে ক্লান্তও হয়ে পড়ত। কারণ, তার গভীরে ছিল জীবনকে উপলব্ধির গোপন শক্তি।
তুমি আমার বিরহে অভ্যস্ত হয়ে যেও না,
আমার মিলনে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না..
.” এই পঙক্তিতে যেমন আছে বিচ্ছেদ, তেমনই আছে এক ধরণের মানবিক আবেগের অস্থায়ীতা
—যা তাঁর লেখার স্বভাবসিদ্ধ ছায়া।
শ্রদ্ধা জানাই বাংলা সাহিত্যের রম্যরচনার রাজপুত্র, চিন্তার ফাজিল পথিক, আর এক আশ্চর্য ‘আড্ডা’র নাম—সৈয়দ মুজতবা আলীকে ।