ভারত ভাগের মূল কারিগর : লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন-
নিজস্ব প্রতিবেদন: ড. ফিরোজ উদ্দিন
* ১৯৪৭ সাল। দীর্ঘ দাসত্ব, অসংখ্য আন্দোলন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ভারত স্বাধীনতার দোরগোড়ায়। কিন্তু এই স্বাধীনতা একসঙ্গে আসেনি—তার সঙ্গে এসেছে দেশভাগের বিভীষিকা। আর এই বিভাজনের পেছনে অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন।
* মার্চ ১৯৪৭ সালে লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তার ওপর দায়িত্ব ছিল যত দ্রুত সম্ভব ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
তিনি ভারতীয় রাজনীতির জটিল পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে তড়িঘড়ি করে বিভাজনের পথে এগিয়ে যান।
* মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা (Mountbatten Plan, ৩ জুন ১৯৪৭):
ভারতকে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা।
হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারত, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্তান।
দেশীয় রাজ্যগুলোকে ভারত বা পাকিস্তানে যোগদানের স্বাধীনতা।
* সীমান্ত কমিশন (Radcliffe Commission):
সিরিল র্যাডক্লিফকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এর ফলে তড়িঘড়ি করে সীমান্ত টানা হয়, যা ভবিষ্যতে কাশ্মীর সমস্যা, পাঞ্জাব ও বাংলার দাঙ্গার জন্ম দেয়।
* প্রায় দেড় কোটি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।
* প্রায় ১০-১২ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায়।
* লাখ লাখ নারী নির্যাতিত হয়।
* ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়গুলির একটি ঘটে।
* কেউ কেউ বলেন, মাউন্টব্যাটেন রাজনৈতিক জটিলতা মেটাতে তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নেন।
আবার অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তিনি সচেতনভাবেই দেশভাগ ত্বরান্বিত করেন যাতে ব্রিটিশরা দ্রুত উপমহাদেশ ছেড়ে যেতে পারে। তার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও ওঠে, বিশেষ করে নেহেরুর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে কংগ্রেসকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
* তারিক আলি (Pakistani historian): "মাউন্টব্যাটেন ছিলেন একজন তড়িঘড়ি করা প্রশাসক। তার অদূরদর্শিতা দেশভাগকে রক্তাক্ত করেছিল।"
* ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক লাপিয়ের (Freedom at Midnight-এর লেখক): "মাউন্টব্যাটেন দেশভাগের নাটকে প্রধান অভিনেতা।
* ভারতের স্বাধীনতা ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটালেও, সেই আনন্দ ম্লান হয়ে গেল দেশভাগের রক্তক্ষয়ী বিভীষিকায়। এই বিভাজনের মূল কারিগর হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তিনি যদি আরও সময় নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করতেন, তাহলে হয়তো এত বিপুল প্রাণহানি ও দুঃখজনক অধ্যায় ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে লেখা হতো না।