অমর বিপ্লবী বাঘা যতীনের বীরগাথা
১৯১৫ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর। সূর্যাস্তের সাথে সাথে বালেশ্বরের বুড়িবালাম নদীর তীরে শেষ হলো এক মহাকাব্যিক যুদ্ধ। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নেতৃত্বদানকারী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে যাওয়া হলো বালেশ্বর সরকারি হাসপাতালে। রক্তে ভিজে গেছে শরীর, গুলির আঘাতে উড়ে গেছে আঙুল, ক্ষত-বিক্ষত পেটের মাংস। তখন স্যালাইনের প্রচলন ছিল না— তার বদলে দেওয়া হলো লেমনেড। কোনোক্রমে সেলাই করা হলো ক্ষতস্থানে।
ব্রিটিশদের নির্দেশ ছিল, যেভাবেই হোক এই "সবচেয়ে ওয়ান্টেড বিপ্লবীকে" বাঁচিয়ে রাখতে হবে, কারণ তার কাছ থেকেই মিলতে পারে বিপ্লবী সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার খবর। গভীর রাতে পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট এসে জেরা শুরু করেন। কিন্তু বাঘা যতীন, মৃত্যুপথযাত্রী হয়েও, একটাই উত্তর দিলেন—
“আমরা মরবো, দেশ জাগবে।”
ভোরের দিকে তাঁর রক্তক্ষরণ শুরু হয় ভয়াবহভাবে। শেষ মুহূর্তে হাসিমুখে উচ্চারণ করলেন—
“এত রক্ত ছিল শরীরে? ভাগ্যক্রমে প্রতিটি বিন্দু অর্পণ করে গেলাম দেশমাতার চরণে।”
১৯১৫ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর সকাল। নিভে গেল স্বাধীনতার সূর্য— বীর বিপ্লবী বাঘা যতীনের জীবন।
তাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে ইংরেজ অফিসার টেগার্ট বলেছিলেন—
“যদি যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ইংরেজ হতেন, তবে ট্রাফালগার স্কোয়ারে নেলসনের পাশে তাঁর মূর্তি স্থাপন করা হতো।”
বাঘা যতীন শুধু লড়লেন না— তিনি লড়াইয়ের ধারা বদলে দিলেন। 'হিট অ্যান্ড রান' কৌশলের বাইরে গিয়ে তিনি আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে দেশকে জাগানোর পথ তৈরি করলেন।
তাঁর মৃত্যুর পরে বিপ্লবীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সেই প্রেরণা। ফাঁসির আগের দিন নীরেন ও মনোরঞ্জন, তাঁদের প্রিয় নেতা বাঘা যতীনের দিদি বিনোদবালা দেবীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন—
“দিদি, কাল আমাদের জীবনের বিজয়া দশমী। মাতৃভূমির স্বাধীনতা প্রার্থনা করে যাবো। আবার যেন এই দেশেই জন্ম নিয়ে দাদার অসমাপ্ত ব্রত পূর্ণ করতে পারি।”
আজ তাঁর ১০৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশবাসী জানায় অমর বিপ্লবী বাঘা যতীনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।