Tranding

জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র: আল-কুরআনুল কারিমের অলৌকিক স্পর্শে আলোকিত দর্শন ও বিজ্ঞান: মোঃ মুস্তাকিম হাসান।।

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরিচালক। শুরু আল্লাহর নামে যিনি পরম করুনাময় ও দয়ালু।

'শপথ বিজ্ঞানময় কুরআনের!' — (সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ২)

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারিম— এটি কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এটি জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দর্শনের এক অফুরন্ত ভান্ডার। এটি মানবজাতির জন্য স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যার প্রতিটি আয়াতে রয়েছে সৃষ্টিজগতের রহস্য উন্মোচন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের সুস্পষ্ট আহ্বান। যখন পৃথিবী জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো থেকে বহু দূরে ছিল, সেই সপ্তম শতাব্দীতে আরবের মাটিতে অবতীর্ণ এই কিতাবই পরবর্তী হাজার বছর ধরে মুসলিমদেরকে করেছে জ্ঞান-চর্চায় অগ্রগামী এবং ইউরোপে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের বীজ বপনে প্রেরণা যুগিয়েছে।

বিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি: অনুসন্ধানের নির্দেশনা

কুরআন বিজ্ঞান শেখানোর বই নয়, কিন্তু এটি বিজ্ঞান চর্চার মূল দর্শন ও পদ্ধতি প্রদান করে। আল্লাহ তা'আলা অসংখ্য আয়াতে মানুষকে তার সৃষ্টি, আকাশ ও পৃথিবীর নিদর্শনাবলি নিয়ে চিন্তা-গবেষণা (তাফাক্কুর), পর্যবেক্ষণ (নাজর) এবং বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ (আকল) করার নির্দেশ দিয়েছেন।

 * প্রথম নির্দেশনা 'ইকরা': পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম নাজিলকৃত বাণী ছিল "পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আলাক, ৯৬:১)। এই 'পড়া' শুধু কিতাবের পাঠ নয়, বরং সৃষ্টিজগতকে পাঠ করার, অনুধাবন করার এবং জ্ঞান অর্জনের এক সার্বজনীন নির্দেশ।

 * সৃষ্টিরহস্যে নিদর্শনের খোঁজ: আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন ও রাতের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯০)। এই আয়াত চিন্তাশীল মানুষকে মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে, যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy), পদার্থবিজ্ঞান (Physics) ও ভূ-তত্ত্ব (Geology) এর প্রধান লক্ষ্য।

দর্শনের মানদণ্ড: জীবনের উদ্দেশ্য ও নৈতিকতা

দর্শন হলো জীবনের অর্থ, মূল্য, জ্ঞান, অস্তিত্ব ও বাস্তবতার মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করা। কুরআনুল কারিম মানবজীবনের এই দার্শনিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছে:

 * মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য: এটি মানুষকে তার অস্তিত্বের মূল উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দেয়, যা হলো আল্লাহর খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করা এবং এই পৃথিবীতে ন্যায় ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠা করা। এই উপলব্ধি জীবনের সকল কর্মকাণ্ডকে একটি নৈতিক ও মহৎ উদ্দেশ্য দান করে।

 * সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য: এটি সত্যকে (আল-হক) সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা সকল জ্ঞান-অনুসন্ধানের চূড়ান্ত লক্ষ্য। কুরআনের দর্শন মানুষকে বিবেক, বুদ্ধি ও প্রত্যাদেশের সমন্বয়ে জীবনকে পরিচালিত করার নির্দেশনা দেয়, যা মানব সভ্যতাকে কেবল বস্তুগত উন্নতি নয়, বরং আত্মিক ও নৈতিক সমৃদ্ধিও এনে দেয়।

আধুনিক বিজ্ঞানে কুরআনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত

আধুনিক বিজ্ঞান যুগে যুগে গবেষণার মাধ্যমে যেসব তথ্য আবিষ্কার করছে, তার অনেক মৌলিক ইঙ্গিতই পবিত্র কুরআন ১৪০০ বছর আগেই তুলে ধরেছে। এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:

১. মহাবিশ্বের সৃষ্টি (বিগ ব্যাং): আধুনিক বিজ্ঞান বলে মহাবিশ্ব একসময় একক পিণ্ড ছিল এবং পরে তা প্রসারিত হয়। কুরআন ঘোষণা করে: "যারা কুফরি করেছে, তারা কি দেখেনি যে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে আলাদা করে দিলাম?" (সূরা আম্বিয়া, ২১:৩০)। এই আয়াতটিই বিগ ব্যাং তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

২. ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology): কুরআনে মানব সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর, যেমন— 'আলাকা' (জমাট রক্তপিণ্ড বা ঝুলে থাকা বস্তু), 'মুদগাহ' (চর্বিত গোশতের ন্যায়)— ইত্যাদি বর্ণনা করা হয়েছে, যা আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তৎকালীন সময়ে মানুষের কাছে অজ্ঞাত ছিল।

৩. জলচক্র (Water Cycle): বৃষ্টিপাত, বাষ্পীভবন ও সঞ্চালনের মাধ্যমে জলচক্রের যে ধারণা আধুনিক বিজ্ঞান দিয়েছে, তা কুরআনে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

আমাদের করণীয়: কুরআনের জ্ঞানকে কাজে লাগানো

কুরআন কোনো বিজ্ঞানের পাঠ্যবই না হলেও, এটি নিঃসন্দেহে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল উৎস ও অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম উম্মাহ একসময় এই কিতাবের নির্দেশনা মেনে চলতো বলেই তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত, রসায়ন ও স্থাপত্যে পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়েছে।

যদি আমরা আবার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের ক্ষেত্রে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে চাই, তবে পবিত্র কুরআনের প্রতি গভীর মনোযোগ দিতে হবে। এর আয়াতগুলোর মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং সৃষ্টিজগতকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যখন কোরআনের নির্দেশনা ও বিজ্ঞানের আবিষ্কার একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, তখনই মানবজাতি সর্বোচ্চ কল্যাণ লাভ করবে।

আসুন, আমরা কুরআনের জ্ঞানকে শুধু তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এটিকে আমাদের গবেষণা, আবিষ্কার ও জীবন দর্শনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করি।(facebook পেজ থেকে সংগৃহীত)

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.