ইসলামিক চিন্তাবিদ সাইয়্যিদ কুতুব (রহ.)–এর শাহাদাত ও তাঁর গ্রন্থ ঘিরে বিতর্ক: একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ ও লেখক সাইয়্যিদ কুতুব (রহ.)–কে ১৯৬৬ সালে মিশরের কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তাঁর কবরের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে আজও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে গবেষকদের একাংশ দাবি করেন।
তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিনই মিশরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপকভাবে তাঁর রচিত তাফসীর গ্রন্থ ‘ফি যিলালিল কুরআন’ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সেদিন সাত থেকে আট হাজার সেট, অর্থাৎ প্রায় ৬৪ হাজার কপি বই ধ্বংস করা হয়। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়—কারও কাছে সাইয়্যিদ কুতুবের কোনো গ্রন্থ পাওয়া গেলে তাকে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও সাইয়্যিদ কুতুবের লেখা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দেয়। তাঁর শাহাদাতের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র ও বেতারে প্রচারিত হলে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন ওঠে—কে এই সাইয়্যিদ কুতুব, এবং কী কারণে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হলো? বিশেষ করে তাঁর তাফসীর গ্রন্থটি নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
প্রকাশনা জগতের তথ্যমতে, লেবাননের বৈরুতে ওই সময় প্রকাশকেরা মজা করে বলতেন—“যে প্রকাশক আর্থিক সংকটে পড়বে, সে যদি বাঁচতে চায় তবে সাইয়্যিদ কুতুবের ‘ফি যিলালিল কুরআন’ ছাপুক।” উল্লেখযোগ্যভাবে, যে বছর তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেই বছরই বইটি সাতটি সংস্করণে প্রকাশিত হয়, অথচ তাঁর জীবদ্দশায় গ্রন্থটি মাত্র একবার প্রকাশিত হয়েছিল।
বর্তমানে ‘ফি যিলালিল কুরআন’ বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে পৌঁছে গেছে এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইসলামি গবেষকরা মনে করেন, এটি কুরআনের আধুনিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
(সূত্র: তাফসীরে সূরা তাওবা, শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম (রহ.), পৃষ্ঠা ২৮৪)
এদিকে, সাইয়্যিদ কুতুব (রহ.)–এর ফাঁসির আগের রাতের একটি ঘটনা নিয়ে ইসলামি মহলে আজও আলোচনা হয়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁকে কালিমা পাঠ করানোর জন্য কারাগারের ইমামকে পাঠানো হয়। কথোপকথনের একপর্যায়ে সাইয়্যিদ কুতুব (রহ.) বলেন—
“যে কালিমা পড়ানোর জন্য আপনি বেতন পান, সেই কালিমার ব্যাখ্যা মুসলিম উম্মাহর সামনে তুলে ধরার অপরাধেই আমাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হচ্ছে।”
এই উক্তি তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তেও বিশ্বাস ও অবস্থানের দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে অনেকের কাছে বিবেচিত হয়।
সাইয়্যিদ কুতুব (রহ.)–এর জীবন, শাহাদাত এবং তাঁর চিন্তাধারা আজও বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে আছে—সমর্থন ও সমালোচনা উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই।