Tranding

হুগলি জেলার ঐতিহাসিক তীর্থভূমি বালিয়াবাসন্তি ও ফুরফুরা শরীফের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য

হুগলি জেলার এক প্রাচীন ও ঐতিহাসিক গ্রাম ‘বালিয়াবাসন্তি’ নিয়ে স্থানীয় ও ঐতিহাসিক মহলে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। এই অঞ্চলে একসময় এক অত্যাচারী ভূস্বামী বাগদিরাজা নামে পরিচিত ছিলেন, যার প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তৃত ছিল বালিয়াবাসন্তি ও পার্শ্ববর্তী এলাকাজুড়ে। সময়টি ছিল বাংলার স্বাধীন সুলতান সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের (খ্রিষ্টাব্দ ১৩০১-১৩২২) শাসনকাল।

অবশেষে এই অত্যাচারী ভূস্বামীর শাসনের অবসান ঘটে কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতা-সম্পন্ন সুফি সাধকদের প্রভাবে। তাঁদের সহায়তা করেন তৎকালীন সুলতানের আঞ্চলিক গভর্নর সপ্তগ্রামের মীর জাফর গাজী (র:)। ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ আছে যে, এই আধ্যাত্মিক সাধকদের মধ্যে প্রধান দুইজন ছিলেন হজরত মনসুর বাগদাদী সিদ্দিকী (র:) ও সৈয়দ হোসেন বোখারী (র:)। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানে আজও শাহ সোলায়মান (র:) ও চার শহীদ গঞ্জে সোহাদাগনের সমাধি ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন মহান সুফি সাধক হজরত মোস্তফা বাঙালি (র:) — যিনি ছিলেন শাহ আবু বকর সিদ্দীক (র:)-এর ঊর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ। তিনি ছিলেন মুজ্জাদ্দিদে আলফে সানী (র:)-এর পুত্র ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী হজরত খাজা মাসুম রব্বানী (হিজরী ১০০৭–১০৭৯) (র:)-এর বঙ্গদেশের প্রধান খলিফা।

বাংলাদেশে হজরত আহমদ সরহিন্দী মুজ্জাদ্দিদে আলফে সানী (র:) (১৫৬৩–১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ)-এর একমাত্র খলিফা ছিলেন হজরত হামিদ বাঙালী (র:) (মৃত্যু ১৬৫৩ খ্রি)। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মোস্তফা বাঙালী (র:) আধ্যাত্মিক জগতে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন।

ফুরফুরা শরীফ আজ বাংলার মুসলমান সমাজে একটি অন্যতম তীর্থস্থান। Hooghly District Handbook (1961)-এ ফুরফুরাকে “a place of pilgrimage for Musalmans” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকাশিত West Bengal District Gazetteers: Hooghly (1972)-এও একে “a place of Muslim pilgrimage” বলে অভিহিত করা হয়েছে।

তদুপরি, “হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ” গ্রন্থে বলা হয়েছে —

“ফুরফুরা বঙ্গের মুসলমানদিগের একটি প্রসিদ্ধ পীঠস্থান। ফুরফুরার পীর বংশে ভক্ত ফকির ও মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করায় এই স্থান বঙ্গের মুসলমানদের নিকট তীর্থক্ষেত্র বলে পরিণত হয়েছে।”

বাংলার ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবর্তক হাজী শরীয়তুল্লাহ (র:) মক্কায় উচ্চশিক্ষা লাভের পূর্বে ফুরফুরায় থেকেই আরবি ও ফারসি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন।

বিংশ শতাব্দীর মহান যুগপুরুষ শাহ আবু বকর সিদ্দীক (র:)-এর জন্মও এই পবিত্র ভূমিতেই। তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাবে ফুরফুরা শরীফ এক আন্তর্জাতিক মানের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। তাঁর সান্নিধ্য লাভের আশায় রাশিয়ার বোখারা, কান্দাহার, পেশোয়ার, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এই তীর্থভূমিতে আগমন করেছেন।

আজও বালিয়াবাসন্তি ও ফুরফুরা শরীফের প্রতিটি মাটি, প্রতিটি সমাধি, প্রতিটি দরগাহ ইতিহাসের এক অনবদ্য অধ্যায়ের স্মারক — যা বাংলার সুফি ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

সংগৃহীত প্রতিবেদন।

Trusted source for latest breaking news, headlines, and updates from around the world.

© Your Bango Darpan News. All Rights Reserved.