শিক্ষক নেই রাজ্যের হাজার হাজার স্কুলে, বিপন্ন মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা
কলকাতা, ২১ অক্টোবর — রাজ্যের স্কুল শিক্ষার হাল বেহাল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৭২ হাজারের বেশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পদ শূন্য। প্রাথমিক স্তরেও প্রায় ৫,৫০০ শিক্ষক নেই। আবার বহু প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়া সংখ্যা তলানিতে। সামগ্রিক শিক্ষা মিশনের (Samagra Shiksha Mission) ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় মূল্যায়ন রিপোর্টে এই উদ্বেগজনক ছবি উঠে এসেছে।
কোথায় কত শিক্ষক নেই?
মাধ্যমিকে শূন্যপদ: ৩৩,৩৬৯
উচ্চ মাধ্যমিকে শূন্যপদ: ৩৮,৮৯৯
প্রাথমিকে শূন্যপদ: ৫,৫০০-এর বেশি
এই সংখ্যাগুলি প্রকাশ পেয়েছে ২০২৪-২৫ সালের প্রজেক্ট অ্যাপ্রুভাল বোর্ড (PAB) রিপোর্টে, যা তৈরি হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালের বাতিল হওয়া ১৭,২০৬ শিক্ষক প্যানেলের আগে।
ভয়াবহ অবস্থা প্রাথমিক স্তরেও
রাজ্যে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের স্কুলের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৬,৭৪৪ ও ৬,৪২৬। তার মধ্যে:
মাত্র ১ জন শিক্ষক রয়েছে: ৫,১৪৯টি স্কুলে
৩০ জনের কম পড়ুয়া: ১১,৫১৫টি স্কুলে
১৫ জনের কম পড়ুয়া: ৩,৬৬৯টি স্কুলে
একটিও পড়ুয়া নেই: ৭৪৭টি স্কুলে
উচ্চ প্রাথমিক স্তরেও একই চিত্র:
মাত্র ১ জন শিক্ষক: ৮৯১টি স্কুলে
৩০ জনের কম পড়ুয়া: ১,৪৭৫টি
১৫ জনের কম পড়ুয়া: ৭২০টি
শূন্য পড়ুয়া: ২৫৯টি স্কুল
শিক্ষকের অভাবে পড়াশোনায় ঘাটতি
পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ স্কুল (মাধ্যমিক ৯,৯৯১ এবং উচ্চ মাধ্যমিক ৬,৭৭৭) কীভাবে চলছে — তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেক স্কুলে যেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষক নেই, সেখানে অন্য বিষয়ের শিক্ষককেই পড়াতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, উচ্চমাধ্যমিকে কেমিস্ট্রি বা বায়োলজির শিক্ষককে পড়াতে হচ্ছে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বা নিউট্রিশন।
শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন
পশ্চিমবঙ্গ প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণাংশু মিশ্র বলেন, “শিক্ষার অধিকার আইনে শিক্ষকদের প্রতি সপ্তাহে ২৫টি টিচিং-লার্নিং ক্লাস এবং ১১টি টিউটোরিয়াল ক্লাস নিতে হয়। ফলে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয় পড়াতে বাধ্য করা হচ্ছে, এতে পড়াশোনার মান ও মূল্যায়ন দুটোতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”
পড়ুয়া ভর্তির হারেও ধাক্কা
ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশনের (UDISE) ২০২২-২৩-এর রিপোর্ট অনুযায়ী:
উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনার হার ৬৭.৫% থেকে কমে হয়েছে ৬৬.১%
মাধ্যমিক পাশ করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির হার রাজ্যে মাত্র ৬৪.২% (জাতীয় গড়: ৭১.৫%)
কেন্দ্রের কড়া বার্তা
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকরা রাজ্যকে দ্রুত শূন্যপদ পূরণের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষক নিয়োগ সংস্থা স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) এখনো ২০১৬ সালের বাতিল হওয়া প্রক্রিয়ার জটেই ব্যস্ত। নতুন করে সওয়া ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ কার্যত অনিশ্চিত।
এ অবস্থায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—শিক্ষকবিহীন স্কুলে পড়াশোনার মান কোথায় দাঁড়াবে? আর তার দায় নেবে কে?