যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা বাণিজ্য টানাপোড়েন তীব্র, আন্তর্জাতিক সেতু উদ্বোধন আটকে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প—গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতুর উদ্বোধন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করে আসছে।
সোমবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে সুবিধা নিলেও মার্কিন স্বার্থকে উপেক্ষা করছে। তাঁর দাবি, অন্টারিও ও মিশিগানের মধ্যে নির্মিত বিশাল সেতু প্রকল্পে প্রায় কোনো মার্কিন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি, যা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পরিপন্থী।
ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে কানাডাকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তারা ‘বাই আমেরিকান’ আইন এড়িয়ে যেতে পেরেছে। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়া হলেও বিনিময়ে আমেরিকা কিছুই পাচ্ছে না—এটা চলতে পারে না।”
মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, কানাডা এখনও বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। বিশেষ করে অন্টারিও প্রদেশে মার্কিন মদ ও অ্যালকোহলজাত পণ্য বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে কানাডার দুগ্ধজাত পণ্যের উচ্চ শুল্ককে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং প্রকল্পে অংশীদারিত্ব না পেলে সেতুর উদ্বোধনে সম্মতি দেবেন না। এমনকি ভবিষ্যৎ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত আংশিক মালিকানা দাবি করার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প ঘিরে অনিশ্চয়তা
গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতুটি কানাডার অন্টারিও প্রদেশের উইন্ডসর শহর এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরকে যুক্ত করবে। এটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় কেবল-স্টেড সেতুগুলোর একটি। প্রায় ২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু দিয়ে ছয় লেনের যান চলাচলের পাশাপাশি পথচারী ও সাইকেল চলাচলের ব্যবস্থাও রয়েছে।
২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার। কানাডা সরকার সম্পূর্ণ অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করছে। করোনা মহামারির কারণে কিছু বিলম্ব হলেও চলতি বছর সেতুটি চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এই করিডোর দিয়েই দুই দেশের মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়।
ট্রাম্প–কার্নি বিরোধের ধারাবাহিকতা
বিশ্লেষকদের মতে, এই হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধেরই ধারাবাহিকতা। ট্রাম্পের আগের মেয়াদে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পুনর্গঠন সেই উত্তেজনাকে বাড়িয়েছিল।
বর্তমান মেয়াদে এসে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক পাচার ও চীনের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক নিয়েও দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে। ট্রাম্প কানাডার চীনের দিকে ঝুঁকে পড়াকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, কানাডা সরকার এই বক্তব্যকে তাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি বলে মনে করছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিকতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অর্থনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে উত্তর আমেরিকার সরবরাহ ব্যবস্থা, বিশেষ করে গাড়ি ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। যদিও আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই সেতুর উদ্বোধন আটকে দেওয়া কঠিন, তবুও ট্রাম্পের হুমকি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেতুটি যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা এখন যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রতীক হয়ে উঠছে।