আমেরিকা-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্রুতগতিতে অগ্রগতি কোলে ধরলেও, সামরিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করেন যে এটি আরও বেশি সংঘাত ও যুদ্ধকে উজ্জীবিত করতে পারে — এক রকমভাবে, এটি শিল্প বিপ্লবের মতো, যা প্রায় ২৫০ বছর ধরে পশ্চিমাকে বিশ্বের নিয়ন্ত্রক করে তুলেছিল।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি “কেন্দ্র ও পার্শ্ব” (Core & Periphery) মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে — যেখানে কয়েকটি প্রধান রাষ্ট্র কেন্দ্রে, এবং অন্য দেশগুলো পার্শ্বে। বহু যুগে, পশ্চিমা বিশ্ব এই কেন্দ্র ছিল। কিন্তু আজ মনে হয়, সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে।
বৈশ্বিক নিয়ম ভাঙার শুরুঃ কী চিহ্ন?
বিশ্বব্যবস্থার পতন ঘটে যখন শক্তি সাম্য (balance of power) ভেঙে যায়। উদীয়মান একটি শক্তি যদি অনুভব করে যে পুরাতন নিয়ম পরিবর্তন করলে তার অবস্থান আরও উন্নত হবে, তাহলে সে নিয়ম পাল্টাতে চায়। সাধারণত, বিদ্যমান শাসকশক্তি (status quo) পুরনো নিয়ম ধরে রাখতে চায়, আর পরিবর্তনশীল শক্তি এগিয়ে আসে — যা সংঘর্ষ বা “বড় দ্বন্দ্ব” ডেকে আনতে পারে।
আজকের বিশ্বে, বর্তমান শাসক — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র — এবং উত্তরণপ্রবণ শক্তি — চীন — উভয়ই একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছে, যদিও তাদের উদ্দেশ্য ও পন্থা একরকম নয়। যদি এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুদ্ধ পর্যায়ে পৌঁছায়, তা শুধু পুরনো নিয়ম ভেঙে দেবে না, সাথে ধ্বংস করবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নীতিমালাগুলিকেও।
প্রচলিত টেকনোলজি ও ক্ষমতার লড়াই
পর্যবেক্ষকরা যুক্তি দেন যে চীন এখনো সরাসরি সামরিক হাজারে পৌঁছে পারেনি — তবে চীনের শক্তি তার বাণিজ্যিক প্রভাব, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ‘বelt and Road’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৫০–৮০০ টি বিদেশী সামরিক ঘাঁটি চালায়, প্রায় ৮০ টি দেশে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০–৫০ হাজার সৈন্য মোতায়েন রয়েছে; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও জাপান-কোরিয়া অঞ্চলে প্রায় ৮০ হাজার; ইউরোপে ন্যাটোর অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সাড়ে ৮০ হাজারেরও বেশি।
চীনের অপেক্ষায়, তার সামরিক উপস্থিতি সীমিত — শুধু জিবুতি ও একটি নৌবহরিক ঘাঁটি — তবে বাণিজ্যিক ক্ষমতায় সে বিস্তৃত।
এই দুই শক্তির সংঘাত ঘটছে প্রযুক্তি, ডেটা, চিপস, এআই এবং সামুদ্রিক পথগুলির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে।
মার্কিন বাহুবল হালকা পড়ছে কি?
ইতিহাসবিদ পল কিনেডি বলেছিলেন যে এক সাম্রাজ্য পতনের একটি মূল কারণ “অত্যধিক প্রসারণ” (overstretch) — অর্থ ও সামর্থ্য এমন হারের দিকে যায় যেখানে সামরিক চাপ আর পরিচালন খরচ সামলানাও কঠিন।
২০২৪ এ, যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত করজ সেবায় (interest on debt) ব্যয় করেছে ৮৭৯.৯ বিলিয়ন ডলার, এবং প্রতিরক্ষা বাজেটে রাখা হয়েছে ৮৭৩.৫ বিলিয়ন ডলার — দুইটা প্রায় সমান মাত্রায়। এই তথ্য প্রশ্ন তোলে: কি আমেরিকা তার তৈরি বিশ্বব্যবস্থা বহন করতে আর সক্ষম?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়াতে তার আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। ইউরোপে প্রাধান্য রক্ষায় “থ্রি সিস” (ট্রিপল সি/ Three Seas) প্রকল্প গুরুত্ব পাচ্ছে — যেখানে পোল্যান্ড এক কেন্দ্রগত ভূমিকা নিতে পারে। এশিয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া চীনের বিরুদ্ধে প্রথম সারির “মনোবল কাঠামো” হবে বলে ধরা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অঞ্চলীয় মিত্র হিসেবে ব্যবহার করার মাধ্যমে নীতি নির্ধারণে যুক্ত হতে চায়, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে।
আফ্রিকার বহু দেশেও রাশিয়া, চীন ও আমেরিকার পাওয়ার লড়াই চলছে — যেখানে কূটনীতি ও সুরক্ষা জাল বিস্তৃত হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কি?
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল সীমান্ত লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে কি? নাকি এটি বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তনের সূচনা? সময় বলবে — তবে ইতিহাস বলে যে আজকের প্রাপ্তিগুলো কালের পথিকৃৎ হতে পারে আগামীকালের স্বপ্ন।