মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ও ইউরোপের ‘অপেক্ষিত মিরাকল’: ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বার্তা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের খসড়া তাতে ইউরোপের মিত্রদের দুর্বল হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার জোরালো বার্তা দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর ২০২৫) হোয়াইট হাউস প্রকাশিত এ নথি ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ এতে ইউরোপীয় নেতাদের অভিবাসন নীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে, এমনকি বলা হয়েছে তারা ‘সভ্যতার বিলুপ্তির’ ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে ইউরোপের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
দলিলটিতে আবারও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি—যা মূলত বিদেশে সামরিক সম্পৃক্ততা কমানো, দীর্ঘদিনের কৌশলগত জোট পুনর্মূল্যায়ন এবং সবকিছুর ওপরে আমেরিকার স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলে।
এটি ২০ জানুয়ারি ২০২৫-এ ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে প্রথম জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল। যা ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়কার নীতির সঙ্গে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। বাইডেন প্রশাসন যেখানে ভেঙে পড়া জোটগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে এবং রাশিয়ার বাড়তি প্রভাব ঠেকাতে চেষ্টা করেছিল, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন সেসব প্রচেষ্টার প্রতি শীতল।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মধ্যস্থতার লক্ষ্য
ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প চার বছর ধরে চলমান রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছেন। নতুন নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন জরুরি, আর তাই যুদ্ধের সমাপ্তি ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত স্থিতিশীলতা পুনঃস্থাপন আমেরিকার মৌলিক অগ্রাধিকার।
অন্যদিকে ইউরোপীয় মিত্ররা ট্রাম্পের যুদ্ধের বোঝা ঝেড়ে ফেলার চাপের মুখে পড়েছে। অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্যে তারা ‘অস্তিত্ব সংকট’ বা ‘সভ্যতাগত সংকটের’ মুখোমুখি—যা নথিতে উল্লেখ আছে।
ইউরোপের ভূমিকা কেন কমছে
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চিন্তায় ইউরোপের গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে কমেছে—এটিও নথিতে ইঙ্গিত করা হয়েছে। শীতল যুদ্ধের পর ইউরোপে একক কোনো শক্তির আধিপত্যের আশঙ্কা কমে গেছে। পাশাপাশি এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
জর্জ বুশ জুনিয়রের আমলে মধ্যপ্রাচ্যে জোর দেওয়া হয়েছিল; পরবর্তী প্রেসিডেন্টরা ‘এশিয়া পিভট’ কৌশল ঘোষণা করেন; ট্রাম্পের আমলে আবার ল্যাটিন আমেরিকাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়—যা তার পানামা, ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়া নীতিতে প্রতিফলিত।
নতুন আমেরিকা, নতুন প্রজন্ম
যুক্তরাষ্ট্রে জনমিতিক পরিবর্তনও কৌশলে প্রভাব ফেলেছে। ‘শীতল যুদ্ধ প্রজন্ম’, যারা স্বভাবগতভাবেই ইউরোপমুখী ছিল, ধীরে ধীরে দৃশ্যপট থেকে সরে যাচ্ছে। তাদের জায়গায় এসেছে বৈচিত্র্যময় তরুণ প্রজন্ম, যারা বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করছে।
ট্রাম্পের ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কে সন্দেহ বরাবরের মতোই গভীর। তাই দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে ইউরোপকে অগ্রাধিকার তালিকায় নিচে নামিয়ে আনা স্বাভাবিক। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য গড়ে ওঠা ন্যাটোর ওপর অতিরিক্ত ব্যয় না করে, রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করাই এখন তাদের কাছে বেশি লাভজনক—এমনটাই ইঙ্গিত মিলছে দলিলে।