বিশ্ব সংখ্যালঘু অধিকার দিবস- সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা কবচ : ডক্টর ফিরোজ উদ্দিন----
"বিশ্ব সংখ্যালঘু অধিকার দিবস" বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী ভাষাগত, জাতিগত, ধর্মগত, শ্রেণীগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন । ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর-সেবকদের দ্বারা ধ্বংসের পর ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ১৮-ই ডিসেম্বর তারিখটি "বিশ্ব সংখ্যালঘু অধিকার দিবস" হিসাবে নির্ধারিত হয় ।
আমাদের মাতৃভূমি ভারত কোনো একক ধর্ম বা একক ভাষার দেশ নয়।
ভারত একটি বৈচিত্র্যের দেশ,
আর এই বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতেই আমাদের দেশের সংবিধান একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান হিসেবে গড়ে উঠেছে। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ডক্টর আম্বেদকরের নেতৃত্বে ভারতের সর্বধর্ম,বর্ণ,জাতি, উপজাতি নির্বিশেষে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে ভারতবাসীর জন্য একটি আদর্শ সংবিধান রচিত হয় ।
ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ১৪ অনুযায়ী আইনের চোখে সবাই সমান।
সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু—এই বিভাজন ভারতের সংবিধান বৈধতা দেয়না।
আর্টিকেল ১৫ ও ১৬ স্পষ্ট করে দেয়—
ধর্ম, জাতি বা ভাষার ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য চলবে না।
চাকরি, শিক্ষা কিংবা সামাজিক জীবনে—সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ।
এরপর আর্টিকেল ২৫ থেকে ২৮ পর্যন্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার অনুযায়ী আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের ধর্ম পালন করতে পারি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারি এবং কেউ আমাদের বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করতে পারে না— যতক্ষণ না তা আইন ও শান্তির পরিপন্থী হয়। পাশাপাশি আর্টিকেল ২৯ আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষার অধিকার দেয়। আর আর্টিকেল ৩০ আমাদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করে।
এছাড়াও সংবিধানের
আর্টিকেল ৩৫০(ক) অনুযায়ী সংখ্যালঘু শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দিতে হবে।
৩৫০(খ) অনুযায়ী ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অভিযোগ শোনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা কার্যকর করার অধিকার দিয়েছে । এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা কোনো দয়া নয় বরং এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
আমরা জানি ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের আলোচনা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে
সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং ঘোষণা করা হয়- আজ থেকে বিশ্বের যেকোন প্রান্তে বসবাসকারী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব
ধর্ম,ভাষা ও সংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার পূর্ণ অধিকার থাকবে ।
ভারত একটি বহুধর্ম, বহুভাষা ও বহু-সংস্কৃতির মিলন ক্ষেত্র। বহুত্ববাদ ভারতীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ও পরম্পরা ।
কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়-
আজও সংখ্যালঘু সমাজের একটি বড় অংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অধিকার থেকে পিছিয়ে আছে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্নভাবে সংখ্যালঘুদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে ।
তাই ১৮ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সংখ্যালঘু দিবস আমাদের সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয় এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
সংখ্যালঘু অধিকার মানে কোনো সম্প্রদায়ের বিরধীতা নয়—বরং এটি সমতা, মানবতা,পারস্পরিক সহবস্থান ও সৌভ্রাতৃত্ব তৈরির পক্ষে দৃঢ় অঙ্গীকার।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত হিংসা নয় শান্তি, ঘৃণা নয়-সম্প্রীতি, বিভাজন নয়-ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করা এবং এমন একটি ভারত গড়ার অঙ্গীকার করতে হবে, যেখানে প্রত্যেক ভারতীয় সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে চলতে পারবে । যে-স্বপ্ন মহাত্মা গান্ধী, পন্ডিত নেহেরু, মাওলানা আজাদ, ডক্টর জাকির হোসেন, বদর উদ্দিন তৈয়েবজি, সীমান্তগান্ধী গাফফার খান, বল্লভভাই প্যাটেল, ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদ, নেতাজি সুভাষ বোস, দেখেছিলেন এবং যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শাহিদ আশফাক উল্লাহ, শাহিদ চন্দ্রশেখর আজাদ, শহীদ ক্ষুদিরাম, শহীদ শের আলী, শহীদ ভগৎ সিং আত্ম-বলিদান দিয়েছিলেন ভারতীয় প্রজন্মের জন্য সেই ভারত গড়ার লক্ষ্যে আমাদের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।
তাই,আজ এই দিনে আমরা সমবেতভাবে শপথ নিই—
আমরা আমাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবো,
ভারতীয় সংবিধানের প্রতি দায়িত্বশীল ও অনুগত থাকবো এবং শান্তি,সম্প্রীতি, সৌহার্দ্যের বার্তা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেব।
শেষে বলব—
যে দেশে, সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে- সেইদশের
গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে নিশ্চিতভাবে । বর্তমানে ভারতে বসবাসকারী প্রায় ৪০% অর্থাৎ কমবেশি প্রায় ৫০-কোটি সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে উপেক্ষা করে এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ করে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়কে তাদের উন্নয়নের বাইরে রেখে কখনোই ভারত উন্নয়নশীল হতে পারবে না । কারণ দেশের ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীকে-ও উন্নয়নের আওতায় না আনা পর্যন্ত সেই দেশ কখনোই প্রকৃত উন্নততর দেশ হিসেবে বিশ্ব-মানচিত্রে স্বীকৃতি পাবে না । আমরা আশাবাদী আমাদের দেশের রাষ্ট্রনায়কগণ আমাদের গর্বের মাতৃভূমি ভারতের সম্মান, ঐতিহ্য,মর্যাদা ও পরম্পরা বিশ্বের সামনে প্রকৃত অর্থে তুলে ধরার জন্য অবশ্যই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। সবশেষে বলতে চাই আমরা যেন গর্ব করে বলতে পারি- "আমরা ভারতীয়- ভারত আমাদের মাতৃভূমি"- পৃথিবীর কোন শক্তি নেই আমাদের থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে আলাদা করতে পারে ।